নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ত্রিশূলী হাসপাতালে ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাস্তুচ্যুতরা

নেপালে ভয়াবহ বন্যা: ত্রিশূলী হাসপাতালে ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে বাস্তুচ্যুতরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপালের ত্রিশূলী বাজারে সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যায় ঘরবাড়ি ও দোকানপাট হারিয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এর মধ্যে ত্রিশূলী হাসপাতাল ও আশপাশের আশ্রয়শিবিরগুলোতে দেখা দিয়েছে জীবন রক্ষাকারী ওষুধ ও বিশুদ্ধ পানীয় জলের তীব্র সংকট। দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত রোগীরা ওষুধ না পেয়ে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন, অন্যদিকে স্যানিটেশন ব্যবস্থার অভাবে পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন চিকিৎসকেরা।
বন্যার তাণ্ডবে ত্রিশূলী বাজারের বাসিন্দা রেখা দেবী গোসাইয়ের বাড়ি এবং মালিকানাধীন চারটি দোকান সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও থাইরয়েডের মতো জটিল রোগে আক্রান্ত রেখা দেবীর নিয়মিত ওষুধ সেবনের প্রয়োজন হলেও বন্যার তোড়ে তা রক্ষা করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে ত্রিশূলী হাসপাতালের কাছে একটি আশ্রয়শিবিরে পরিবারের সঙ্গে অবস্থান করলেও স্থানীয় হাসপাতালে প্রয়োজনীয় ওষুধ না মেলায় গত তিন দিন ধরে তিনি কোনো ওষুধ সেবন করতে পারছেন না।
একই ধরনের সংকটে পড়েছেন কোলানি এলাকার ৬২ বছর বয়সী হাঁপানি রোগী এক নারী। তার দেখাশোনা করা কোপিলা পারিয়ার জানান, নিয়মিত সেব্য একাধিক ওষুধ না পাওয়ার পাশাপাশি আশ্রয়শিবিরে বিশুদ্ধ পানির চরম সংকট তৈরি হয়েছে। পর্যাপ্ত টাকা ও কাপড় না থাকায় এবং স্থানীয় বাজারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বোতলজাত পানি কেনারও সামর্থ্য নেই তাদের। এছাড়া এই পরিবারের ১৬ বছর বয়সী অবিনাশ ও ৪৩ বছর বয়সী শান্তি নামের দুজন সদস্য এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় বিরতি ঘটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। অথচ ত্রিশূলী হাসপাতাল নিজেই বর্তমানে মারাত্মক ওষুধ সংকটের মুখোমুখি। এর বাইরে আশ্রয়শিবিরগুলোতে জরুরি প্রসূতি চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি আশ্রয়শিবিরে থাকা এক প্রসূতির প্রসববেদনা উঠলে স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় বারবার অনুরোধের পর তাকে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুর থাপাথালির প্যারোপকার মাতৃ ও নারী হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
ওষুধের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বন্যায় হাসপাতাল ও আশপাশের বসতির পানীয় জলের প্রধান উৎসগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাসিন্দারা ত্রিশূলী জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের যে খাল থেকে পানি সংগ্রহ করতেন, তা বন্যায় সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশাপাশি আরেকটি পানির পাইপলাইনও ভেসে যাওয়ায় নিরাপদ পানির উৎস সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। বাধ্য হয়ে মানুষ অনিরাপদ ও যেকোনো প্রাপ্ত পানি ব্যবহার করছেন।
ত্রিশূলী হাসপাতালের আশপাশের বাঘতার এলাকায় ভৈরুং মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি আচ্ছাদিত হল এবং বেথান একাডেমিতে প্রায় এক হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। গর্ভবতী নারী ও প্রসূতিসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের এই ঘনবসতিতে স্যানিটেশন ও টয়লেটের পর্যাপ্ত নিষ্কাশনব্যবস্থা না থাকায় জনস্বাস্থ্য মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে।
ত্রিশূলী হাসপাতালের মেডিকেল সুপারিনটেনডেন্ট রাজেন্দ্র লামা জানিয়েছেন, একই স্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষের গাদাগাদি করে বসবাস এবং নিরাপদ পানির অনুপস্থিতির কারণে বড় ধরনের রোগপ্রাদুর্ভাব বা মহামারি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, নেপালে বয়ে যাওয়া এই আকস্মিক বন্যায় পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে প্রশাসন। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বন্যায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ৭৩৪ জনে পৌঁছেছে। পাশাপাশি এখনও নিখোঁজ রয়েছেন দুই হাজার ৪৯৮ জন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারে উদ্ধারকর্মীদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জাতীয় শীর্ষ সংবাদ