অর্থনীতি প্রতিবেদক
দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সংকটের জন্য অতীতের ভুল জ্বালানি নীতি, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতা এবং জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তুলতে ব্যর্থতাকে দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। তিনি জানান, বর্তমানে যে জ্বালানি সংকট চলছে, তার বড় অংশই অতীতের ত্রুটিপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও পরিকল্পনার ফল।
আজ রাজধানী ঢাকায় ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) এবং সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) যৌথভাবে আয়োজিত ‘অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উদীয়মান চ্যালেঞ্জ : আগামী দিনের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইআরএফ সভাপতি দৌলত আকতার মালা। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ, এফবিসিসিআই প্রশাসক ফজলুল হক এবং সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন।
সেমিনারে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য ও সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ছে। বর্তমানে কাতার থেকে এলএনজি আমদানিতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ১১ ডলার ব্যয় হচ্ছে। অথচ দেশে পর্যাপ্ত নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের সক্ষমতা থাকলে উল্লেখযোগ্য কম খরচে জ্বালানি সরবরাহ করা সম্ভব হতো। অতীতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে আমদানিনির্ভরতা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্য অর্জনে উদাসীনতার কারণে আজকের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, জ্বালানি খাতের অনিয়ম ও ভুল নীতির অর্থনৈতিক ব্যয় বা ‘কস্ট অব ইনঅ্যাকশন’, ভুল সিদ্ধান্তের আর্থিক ক্ষতি, দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর তৈরি হওয়া ঋণের দায়—এই বিষয়গুলো নিরূপণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি, বিশ্ববিদ্যালয় ও থিংক ট্যাংকগুলোকে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা পরিচালনার আহ্বান জানান তিনি। অতীতের স্বজনতোষী নীতি ও আমদানিনির্ভরতার ফলে জ্বালানি খাতে একটি অলিগার্কিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল, যা দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে বলে তিনি জানান।
বর্তমান সরকারের ভবিষ্যৎমুখী পদক্ষেপ তুলে ধরে উপদেষ্টা জানান, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং চার হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের উৎপাদক হিসেবে গড়ে তোলার পাশাপাশি সৌরবিদ্যুৎ ও সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামে ভ্যাট ও কর ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক খাতের অন্যান্য সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ১৫০ শয্যার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা পর্যায়ে কিডনি ডায়ালাইসিস ও করোনারি কেয়ার ইউনিট গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া লুটপাট ও সরবরাহ ব্যবস্থার অনিয়মের কারণে অতীতে মূল্যস্ফীতির ওপর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা কমিয়ে বর্তমানে ৮ শতাংশের সামান্য বেশি থাকা মূল্যস্ফীতিকে ধীরে ধীরে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর বিষয়ে তিনি জানান, প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। চলতি মাস থেকেই বন্ধ শিল্পে এই অর্থায়ন কার্যক্রম শুরু হবে। এছাড়া রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে কাস্টমস হাউসের কার্যকারিতা জোরদার করা হয়েছে এবং সরকারের প্রথম প্রান্তিক শেষে অক্টোবরের মাঝামা সময়ে বিস্তারিত অগ্রগতি জাতির সামনে তুলে ধরা হবে বলে তিনি জানান।


