বাক স্বাধীনতা যেন বাক শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গালাগালির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘বর্তমানে দেশে গণতান্ত্রিক একটি পরিবেশ বিরাজ করছে, বাক স্বাধীনতা অবারিত। কিন্তু আমাদের মনে রাখা দরকার, বাক স্বাধীনতা যেন বাক শালীনতার সীমা লঙ্ঘন না করে।’ বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই না দেশের জনগণের কাঁধে ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচারী শাসন চেপে বসুক। ঠিক তেমনি কোনো বিবেকবান মানুষ, দেশপ্রেমিক রাজনীতিবিদ অবশ্যই চান না আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গালাগালিতে পরিণত হোক। এ জন্য দল-মত নির্বিশেষে আমাদের সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।'

প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, পারিবারিক পরিবেশে আমরা যে সব কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না, কেন আমরা জনপরিসরেও সেই শব্দগুলো ব্যবহার করব? কেন আমরা জনপরিসরেও সেই শব্দগুলোকে পরিহার করব না? সংসদের সব সদস্যের কাছে, দেশের সব বিবেকবান নাগরিকের কাছে এ প্রশ্ন রেখে যেতে চাই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যদি সত্যিই সবাই এ ব্যাপারে একমত হই, তবে আসুন আমরা গালাগালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে ভূমিকা গ্রহণ করি।

আমাদের মধ্যে বিরোধ-বিভেদ ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি দলই বলি, বিরোধী দলই বলি আমরা সবাই মিলে আসুন একটি কল্যাণকর রাষ্ট্র গড়ে তুলি। সে কারণে সবসময় আমি বলার চেষ্টা করি, আমি বলে থাকি ‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’।

জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ-বিরোধ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, সেই পথকেই সুগম করতে পারে, এটি যেন আমরা ভুলে না যাই। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই শহীদদের প্রতি কর্তব্যের অংশ হিসেবে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে।'

তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্র এবং গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে। সারা পৃথিবীতেই সেটি থাকে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাও থাকবে। এটিও ডেমোক্রেটিক প্র্যাকটিস। কিন্তু ভিন্ন মত যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়, সে ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।

সংসদ সব কর্মের কেন্দ্রবিন্দু উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংসদকে আমরা সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু করতে চাই। এই অধিবেশনে যে আলোচনাগুলো আমরা করেছি।

আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের কারও সদিচ্ছার যে অভাব ছিল না, সেটি নিশ্চয়ই প্রমাণিত হয়েছে। আমরা উভয়পক্ষ দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থে যে কাজ করছি, দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থে যে আলোচনা করেছি, কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করার চেষ্টা করেছি, সে ব্যাপারে আমার কোনো বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। তিনি বলেন, এই সংসদকে কার্যকর ও প্রাণবন্ত রাখার জন্য আমি আজ উপস্থিত সব সংসদ সদস্যকে আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাতে চাই। প্রত্যেকটি গণতন্ত্রকামী মানুষের প্রত্যাশা এই জাতীয় সংসদের কাছে। এই জাতীয় সংসদে আলোচনা করে জনগণের সমস্যা কিছুটা হলেও লাঘব করবে, এই সংসদ তাদের জন্য শান্তি এবং সমৃদ্ধি বয়ে আনবে, এটিই জনগণের প্রত্যাশা।

দেশের অর্থনীতি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ সালে জনগণের রায় প্রত্যাখ্যাত অপশক্তি ষড়যন্ত্রের পথ ধরে ২০০৯ সালে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আবার রাষ্ট্র ক্ষমতা কুক্ষিগত করে। তারা জনগণের অধিকারকে কেড়ে নেয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালানোর আগে পর্যন্ত তাদের দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট আর টাকা পাচারের কারণে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপের অপবাদ সইতে হয়েছে। এই ঋণখেলাপির অভিশাপ থেকে বাংলাদেশকে মুক্ত করার দায়িত্ব এখন বিএনপির কাঁধে পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এরা পালিয়ে গেছে, কিন্তু এই ঋণ রেখে গেছে এই দেশের কাঁধে, এই দেশের জনগণের কাঁধে। পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্টরা শুধু ঋণখেলাপি করেনি বরং ঋণখেলাপির পরিমাপের যে হিসাব-নিকাশ, সেটির মধ্যেও তারা জালিয়াতি করেছে। এমন পরিস্থিতিতেই বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বাংলাদেশকে ঋণখেলাপির অভিশাপ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিভিন্ন উদ্যোগের ফলে বর্তমানে ঋণখেলাপির অনুপাত কমে দাঁড়িয়েছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ। বিগত নির্বাচনের পরে যেখানে ৩৫ দশমিক ৫ শতাংশ ছিল, সেখানে এটি নেমে এসেছে ৩২ দশমিক ৬ শতাংশ। অর্থাৎ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে শুরু করেছে বর্তমান বিএনপি সরকারের অধীনে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিস্ট চক্রের অনাচার, লুটপাট, দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে বিএনপি যেভাবে বাংলাদেশকে মুক্ত করে নিয়ে এসেছিল, একই চক্রের কারণে ২০২৪ সালে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ঋণখেলাপির যে কলঙ্ক, এর থেকেও বিএনপি বাংলাদেশকে ইনশাল্লাহ মুক্ত করে নিয়ে আসবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বিদেশি ঋণের ভারে জর্জরিত একটি রাষ্ট্র আমরা পেয়েছি। যারা বাংলাদেশকে ঋণের ভারে জর্জরিত করেছে, তাদের অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু বাংলাদেশকে এখনো সেই ঋণ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বর্তমান সরকার গত পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণের আসল ও সুদ বাবদ রেকর্ড ২০৪ কোটি ৭৬ লক্ষ মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছে। যদিও ফ্যাসিবাদের লুটতরাজ, টাকা পাচারের কারণে এখনো দেশের কাঁধে, জনগণের কাঁধে হাজারো কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ বাকি রয়ে গেছে।

জাতীয়