ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধের তীব্র উত্তাপ এবং বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে অনিশ্চয়তার মধ্যেই ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হয়েছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের ১৮তম বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলন। আয়োজক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানসহ বিশ্বের এক ডজনের বেশি শীর্ষ নেতা এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।
ধনী পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যের অধীন থাকা অর্থনৈতিক জোটগুলোর বিপরীতে একটি ভারসাম্য সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে ব্রিকস ক্রমশ নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। আল জাজিরায় প্রকাশিত সংবাদের আলোকেই তুলে ধরা হলো এবারের সম্মেলনের মূল প্রেক্ষাপট।
ব্রিকস কী, সদস্য কত২০০৬ সালে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে গঠিত বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়। ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা এতে যোগ দেয়। ২০২৩ সালে মিসর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে অন্তর্ভুক্ত করার মধ্য দিয়ে জোটের পরিধি আরও বাড়ানো হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া এতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়। বর্তমানে বিশ্বের ১১টি দেশের এই জোট বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে। বিশ্ব জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ রয়েছে এই দেশগুলোর নিয়ন্ত্রণে।
কারা থাকছেন সম্মেলনেসম্মেলনে স্বাগতিক ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছাড়াও যোগ দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান, মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দা সিলভা স্থানীয় নির্বাচনের কারণে আসতে না পারায় দেশটির পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েইরা। এ ছাড়া সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান এবং আমিরাতের আবু ধাবির যুবরাজ শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত রয়েছেন। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গেব্রেয়েসুস এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মহাপরিচালক এনগোজি ওকোনজো-ইওয়েলা।
ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে টানাপোড়েনএ বছর এমন এক সময় ব্রিকসের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ সংঘাত তুঙ্গে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা এবং লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি তেলবাহী জাহাজে পাল্টা হামলা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে আঘাত এনেছে।
ব্রিকসের নতুন সদস্য ইরানের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা এবং সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ইয়েমেনের হুথিদের হামলা জোটটির ভেতরেই কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন করে তুলেছে। এর আগে মে মাসে ব্রিকস পররাষ্ট্রমণ্ডলীর বৈঠকে যৌথ কোনো বিবৃতি প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সশরীরে উপস্থিতি বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সঙ্গে মস্কোর অবস্থান তুলে ধরার বড় সুযোগ তৈরি করেছে।
ডিজিটাল মুদ্রা ও জ্বালানি নিরাপত্তাপশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা রাশিয়া ও ইরানের অর্থনৈতিক সুরক্ষায় বিকল্প বাণিজ্য ব্যবস্থার তাগিদ রয়েছে। সম্মেলনে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো এবং প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আদান-প্রদান নিয়ে কথা বলবেন নেতারা।
ভারতের বেঙ্গালুরুভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান তক্ষশীলা ইনস্টিটিউশনের জিওস্ট্র্যাটেজি প্রোগ্রামের প্রধান মনোজ কেওয়ালরামানি জানান, ব্রিকস নেতারা যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করবেন, সেগুলো মূলত বিশ্বজুড়ে চলমান সংঘাতের মধ্যেও বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে সম্পর্কিত।
সাত বছর পর ভারতে শি, সম্মেলন কেন গুরুত্বপূর্ণ২০২০ সালে গালওয়ান উপত্যকায় দুই দেশের সামরিক সংঘাতের পর এই প্রথম ভারত সফরে এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। দীর্ঘ সাত বছর পর তার এই দিল্লি সফর বেইজিং ও নয়াদিল্লির ঠান্ডা কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। এছাড়া আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শি জিনপিংয়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের কথা রয়েছে। সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের ঠিক আগেই ব্রিকস নেতাদের এই জমায়েত বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে নতুন বার্তা দিচ্ছে।
পশ্চিমাদের জন্য কি এটি দুশ্চিন্তার বিষয়বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকস কোনো ন্যাটো বা সামরিক জোট নয় যেখানে সব ইস্যুতে ঐকমত্য থাকা বাধ্যতামূলক। বরং এটি বিভিন্ন মতের দেশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নিজস্ব স্বায়ত্তশাসন বজায় রাখার সুযোগ দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রিকসকে পশ্চিমাবিরোধী বললেও, মূলত নিজেদের অর্থনৈতিক সুরক্ষা ও বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার জন্যই দেশগুলো ব্রিকসের পরিধি বাড়াতে একমত হয়েছে।

