বিশ্ব গণতন্ত্র দিবস: ক্ষমতা ছাড়তে না চাওয়ার রাজনীতি

জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া সব রাজনৈতিক দল গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়ে একমত হয়েছিল। কোনো ব্যক্তি একাধিক মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হলেও মোট ১০ বছরের বেশি ওই পদে থাকতে পারবেন না। তবে মাঠের রাজনীতির বাস্তব চিত্র ঠিক এর বিপরীত।

রাজনৈতিক দলগুলো দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদ বা প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিতে রাজি। তবে নিজেদের দলীয় প্রধানের পদে একজন ব্যক্তি কতদিন থাকবেন, সে বিষয়ে কোনো সীমা নেই বা খুব কম দলই তা মেনে চলে।

এতে বড় একটি প্রশ্ন সামনে আসে, দলগুলো যদি দেশের জন্য গণতন্ত্র চায়, তাহলে তাদের নিজেদের মধ্যেও কি গণতন্ত্রের চর্চা থাকা উচিত নয়?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, দীর্ঘদিন ধরে একই ব্যক্তির হাতে নেতৃত্ব কেন্দ্রীভূত থাকছে। দলীয় প্রধানেরা বছরের পর বছর, এমনকি কয়েক দশকও একই পদে থাকছেন। সাধারণত অসুস্থতা, আইনি জটিলতা বা মৃত্যুর কারণেই কেবল তাদের নেতৃত্বের অবসান ঘটছে।

রাজনৈতিক দল গণতন্ত্রের চর্চার জায়গা হওয়ার কথা। দলগুলো নাগরিকদের রাজনীতিতে যুক্ত করে, নেতৃত্ব তৈরি করে, মতের ভিন্নতা মেনে নেওয়ার শিক্ষা দেয় এবং ভোটারদের সামনে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিকল্প তুলে ধরে। কিন্তু দল যখন প্রতিষ্ঠানের বদলে এক ব্যক্তিকে ঘিরে পরিচালিত হয়, তখন রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার অনেক আগেই গণতন্ত্র দুর্বল হতে শুরু করে।

দলীয় গঠনতন্ত্রে কাউন্সিল ও নেতৃত্ব নির্বাচনের কথা থাকে। কিন্তু বাস্তবে এসব আয়োজন অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। নির্বাচন হলেও তাতে তৃণমূলের অংশগ্রহণ কতটা থাকে, সেটাও প্রশ্নের বিষয়।

এটা শুধু দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এর প্রভাব পড়ে রাষ্ট্র পরিচালনাতেও।

যে রাজনীতিবিদ বিতর্ক ও প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে নেতৃত্বে উঠে আসেন, তিনি জবাবদিহি করতে এবং ভিন্নমতের মানুষের সঙ্গে সমঝোতা করতে শেখেন।

অন্যদিকে এসব অভিজ্ঞতা ছাড়াই যে রাজনীতিবিদ পদ-পদবিতে এগুতে থাকেন, তিনি ভিন্ন অভিজ্ঞতা পান। তিনি বুঝতে শেখেন, যুক্তি দিয়ে মানুষকে রাজি করানোর চেয়ে আনুগত্য দেখানোই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ।

দল যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় যায়, তখন এই পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

শেখ হাসিনা ১৯৮১ সাল থেকে, অর্থাৎ ৪৫ বছর ধরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আছেন। অন্যদিকে ২০২৫ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৪০ বছর বিএনপির চেয়ারপারসন ছিলেন খালেদা জিয়া।

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠার পর ১৯৮৬ সাল থেকে ২০১৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দলটির নেতৃত্বে ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

জামায়াতে ইসলামীর গোলাম আযম ২১ বছর দলটির নেতৃত্বে ছিলেন। এরপর ২০১৬ সালে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগ পর্যন্ত ১৬ বছর দলের শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী।

অন্য দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়।

ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) নেতৃত্বে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ৫২ বছর ছিলেন মোজাফফর আহমদ।

ড. কামাল হোসেন ৩০ বছর ধরে গণফোরামের নেতৃত্বে আছেন। ওয়ার্কার্স পার্টির নেতৃত্বে ২০ বছর ধরে রয়েছেন রাশেদ খান মেনন।

হাসানুল হক ইনু তার নেতৃত্বাধীন জাসদ অংশের প্রধান হিসেবে আছেন ২৪ বছর ধরে। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ২০২২ সাল পর্যন্ত ৩০ বছর কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাধারণ সম্পাদক বা সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। খালেকুজ্জামান ২০২২ সাল পর্যন্ত ৪২ বছর বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) নেতৃত্বে ছিলেন।

আ স ম রব ২০০১ সাল থেকে তার নেতৃত্বাধীন জাসদ অংশের প্রধান। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির নেতৃত্বে রয়েছেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। তিনি ২০০৮ সাল থেকে দলটির প্রধান।

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ২০০২ সাল থেকে জাতীয় পার্টির আরেকটি অংশের নেতৃত্বে আছেন। গণসংহতি আন্দোলনের নেতৃত্বে ২০০২ সাল থেকে ছিলেন জোনায়েদ সাকি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সংসদ সদস্য হওয়ার পর তিনি দলটির নেতৃত্ব থেকে সরে আসেন।

জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের নেতৃত্বে ২০০৩ সাল থেকে ছিলেন বদরুদ্দীন উমর। ২০২৫ সালে তার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।

একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ২০০৪ সালে বিকল্পধারা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেন। ২০২৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ২০ বছর তিনি দলটির সভাপতি ছিলেন।

লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) নেতৃত্বে আছেন অলি আহমদ। তিনি ২০০৬ সাল থেকে দলটির প্রধান। বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দিলীপ বড়ুয়া আছেন ১৯৮৭ সাল থেকে।

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের নেতৃত্বে আবদুল কাদের সিদ্দিকী রয়েছেন ১৯৯৯ সাল থেকে। বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সাইফুল হক আছেন ২০০৪ সাল থেকে।

ধর্মভিত্তিক ও ইসলামপন্থী দলগুলোর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতৃত্বে সৈয়দ রেজাউল করিম আছেন ২০০৬ সাল থেকে।

বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী আছেন ২০০৫ সাল থেকে।

বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন মুহাম্মদউল্লাহ হাফেজ্জী। ১৯৮১ সালে প্রতিষ্ঠার পর তার মৃত্যুর পর ছেলে শাহ আহমাদুল্লাহ আশরাফ দলটির নেতৃত্ব দেন। ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে ছিলেন।

জাকের পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে মোস্তফা আমীর ফয়সাল আছেন ১৯৮৯ সাল থেকে।

এই দিক থেকে বিবেচনা করলে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংকট যতটা না সংবিধানগত সমস্যা, তারচেয়েও আমাদের চিন্তাধারা, চর্চা ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে।

কীভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হবে, তা নিয়ে বাংলাদেশে কয়েক দশক ধরে আলোচনা হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতারা কীভাবে ক্ষমতা ভাগ করবেন, ক্ষমতার সীমা মেনে চলবেন এবং শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ছেড়ে দেবেন, সেদিকে তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে রাজনীতিতে এই বৈপরীত্য গভীরভাবে গেঁথে গেছে।

আন্তর্জাতিক