রপ্তানি বহুমুখীকরণের অন্যতম প্রধান খাত হিসেবে হালাল পণ্যকে বিবেচনা করে একটি স্বতন্ত্র ও একক ‘বাংলাদেশ হালাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই)। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের হালাল সনদ, অ্যাক্রেডিটেড পরীক্ষাগার, দক্ষ জনবল তৈরি ও বিভিন্ন দেশের সঙ্গে হালাল সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তির সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
গতকাল সোমবার ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ হালাল পণ্যের সম্ভাবনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ব্রিফ করেন। এ সময় বিসিআইয়ের তৈরি ‘হালাল পণ্য বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণের অন্যতম প্রধান খাত’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে বিসিআই।
এরই মধ্যে প্রতিবেদনটি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব এবং বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার প্রধানদের কাছেও পাঠানো হয়েছে। বিসিআই বলছে, বিশ্বে হালাল পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৬ সালের হিসাবে এ বাজারের আকার ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ ধরে ২০৩৪ সাল নাগাদ এ বাজার ৯ দশমিক ৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ বিশাল এ বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এখনো খুবই কম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বর্তমানে প্রায় ৯৪ কোটি ডলারের হালাল পণ্য রপ্তানি করে। দেশের মোট রপ্তানির বড় অংশ তৈরি পোশাকনির্ভর। এলডিসি থেকে উত্তরণের পর বিদ্যমান বিভিন্ন বাণিজ্য সুবিধা কমে যাওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে রপ্তানি বহুমুখীকরণ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় হালাল পণ্যকে সম্ভাবনাময় একটি খাত হিসেবে দেখছে বিসিআই।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মুসলমানের পাশাপাশি অন্য ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও হালাল পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার মুসলিম জনগোষ্ঠীসমৃদ্ধ দেশগুলোতে বাংলাদেশের হালাল পণ্যের বড় বাজার তৈরির সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান হালাল পণ্য রপ্তানি করছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রাণ গ্রুপ, বেঙ্গল মিট প্রসেসিং, আকিজ, স্কয়ার, গোল্ডেন হারভেস্ট ও আহমদউল্লাহ অ্যাগ্রো ফুডস। দেশে হালাল পণ্যের রপ্তানি মূলত বেসরকারি উদ্যোগেই শুরু হয়েছে।
বিসিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে হালাল সনদ দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালে। পরে ইসলামিক ফাউন্ডেশন মালয়েশিয়ার জাকিমের সহায়তায় ২০১১ সাল থেকে হালাল সনদ দিচ্ছে। অন্যদিকে ওআইসি-এসএমআইআইসির অনুমোদন নিয়ে ২০২২ সাল থেকে বিএসটিআইও হালাল সনদ দিচ্ছে।
তবে দেশে একক ও মানসম্মত হালাল সনদ প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ না থাকায় উদ্যোক্তাদের বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অ্যাক্রেডিটেড হালাল পরীক্ষাগার না থাকায় সনদ পেতে সময় ও ব্যয় বাড়ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের হালাল পণ্যের আলাদা ব্র্যান্ডিংও তৈরি হচ্ছে না।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে একটি স্বতন্ত্র ‘বাংলাদেশ হালাল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বিসিআই। এই কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে হালাল সনদ প্রদানসহ এ খাতের সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যেসব দেশে বর্তমানে হালাল পণ্য রপ্তানি করছে, সেসব দেশের চাহিদা অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মানের সনদ ও অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালদ্বীপ, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারসহ সম্ভাবনাময় বাজারের সঙ্গে হালাল সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি চুক্তি করতে হবে।
হালাল পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানির সক্ষমতা বাড়াতে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ওআইসি-এসএমআইআইসি, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি সহযোগিতা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে আন্তর্জাতিক মানের হালাল পরীক্ষাগার স্থাপন ও দক্ষ জনবল তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
হালাল পণ্যের রপ্তানি আলাদাভাবে চিহ্নিত ও পরিমাপের জন্য সংশ্লিষ্ট এইচএস কোডের পাশাপাশি পৃথক ‘হালাল কোড’ তৈরির উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। এ খাতের প্রচার বাড়াতে দেশে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক হালাল মেলা আয়োজন এবং বিদেশে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক হালাল মেলায় বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে বিসিআই।
প্রতিবেদনে হালাল শিল্পের জন্য শিল্প, বাণিজ্য, পররাষ্ট্র, ধর্ম, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ জন্য একটি সহায়ক জাতীয় হালাল নীতিমালা প্রণয়ন করে দীর্ঘমেয়াদি হালাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছে।
এতে হালাল পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ বছরের নীতি সহায়তা ও প্রণোদনা পরিকল্পনা নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০৩৪ ও ২০৪০ সালকে সামনে রেখে হালাল পণ্য ও সেবা রপ্তানির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ভিশন পরিকল্পনা প্রণয়নের কথাও বলা হয়েছে।
বিসিআই জানায়, হালাল পণ্যের সম্ভাবনা নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে কাজ করছে সংগঠনটি। এর অংশ হিসেবে গত ১৭ জানুয়ারি সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক এবং ১৮ জুলাই দিনব্যাপী কর্মশালা আয়োজন করা হয়। এসব আলোচনা ও মতামতের ভিত্তিতেই হালাল পণ্য নিয়ে পলিসি গাইডলাইন বা প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

