রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় বিএনপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে জাতীয় সংসদে গিয়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি।
বের হওয়ার সময় সংসদ ভবনের টানেলে সাংবাদিকেরা ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে তার পদত্যাগের বিষয়ে প্রশ্ন করলেও তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
সাক্ষাৎ শেষে মিষ্টি বের হলে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'আমি স্পিকারের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি, কথা বলেছি।'
এর আগে, ফেরদৌস আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) দুপুরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবু আবদুল্লাহ এম ছালেহ।
দলীয় ও সরকারি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী দুই দিন আগে এমপি মিষ্টিকে তলব করেন। এ সময় ঘটনার বিষয়ে তার দেওয়া ব্যাখ্যায় প্রধানমন্ত্রী সন্তুষ্ট হননি। পরে গোয়েন্দা প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে গতকাল মৌখিকভাবে তাকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। গতকাল রাতে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ওই কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা থেকে ২টার মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। আলোচনায় আসে এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির নামও।
সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেন, ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের নাম এসেছে।
এ ঘটনায় করা মামলায় মিরপুরের বিএনপি নেতা মো. হানিফ মিয়ার নাম উল্লেখ করে ২০০ থেকে ২৫০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অনধিকার প্রবেশ, চুরি, হুমকি ও দেড় কোটি টাকার বেশি ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, মুখোশ পরা ২০০ থেকে ২৫০ জনের একটি দল দেশীয় অস্ত্র নিয়ে রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা চালায়। তারা দুই নিরাপত্তাকর্মীকে জিম্মি করে ক্লিনিকে ঢুকে ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরে ভারী যন্ত্রপাতি এনে একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবনসহ পুরো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। ভবন ভাঙার পর সেখানে 'সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড'-এর সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙিয়ে দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ফেরদৌসী আহমেদ ২০০৬ সালে শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার থাকাকালে ওই সমিতির সভাপতি ছিলেন। তখন ওই সমিতির নামে রাড্ডা সেন্টারের জায়গাটি বরাদ্দ দেওয়ার জন্য গৃহায়ণ ও গণপূর্ত কর্তৃপক্ষের কাছে যে আবেদন করা হয়েছে, তাতে সভাপতি হিসেবে সই করেছিলেন ফেরদৌসী আহমেদ।
তবে মিষ্টি টিবিএসের কাছে হামলায় নিজের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কীভাবে এ ঘটনায় তার নাম আসলো, তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
তার বক্তব্য, ২০০৬ সালে ওয়ার্ড কমিশনার থাকাকালে সমিতির নামে জায়গা বরাদ্দের আবেদনপত্রে তার স্বাক্ষর ছিল; এরপর সমিতির সঙ্গে তার আর কোনো সম্পর্ক নেই।
এছাড়াও, টিবিএসের অনুসন্ধানে রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় বেরিয়ে আসে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদল নেতাসহ আরও অনেকের নাম।
সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামলার আগে শাহ আলী থানার পাশে স্থানীয় বিএনপি ও ছাত্রদল নেতার অফিসের সামনে লোকজন জড়ো হয়। পরে তাদের একটি অংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যায়। হামলার সময় ঘটনাস্থলের আশপাশে একটি সাদা মাইক্রোবাস এবং কয়েকটি মোটরসাইকেলের গতিবিধিও ওই এলাকার বিভিন্ন সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়ে।
টিবিএসের হাতে আসা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ওই মাইক্রোবাসে ছিলেন হানিফ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন এবং ঢাকা মহানগর যুবদলের সাবেক সদস্যসচিব মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেলসহ আরও কয়েকজন। এছাড়া ভাঙচুরের নেতৃত্বে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আওলাদ হোসেন ওরফে নাডা আওলাদ এবং ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ইলিয়াসের নামও এসেছে।
হামলা ও ভাঙচুরের সময় মাইক্রোবাসটি থেকে ঘটনাস্থলের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছিল বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র।
হানিফ মিয়া, আবুল কালাম আজাদ ওরফে লেলিন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির ঘনিষ্ঠ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তাদের মধ্যে লেলিন ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে এলাকায় ব্যানার ও পোস্টার লাগিয়েছেন।
একই ওয়ার্ডে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির আত্মীয় হানিফও কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী বলে স্থানীয়রা জানান।
পুলিশি তদন্ত দলের ধারণা ওই গাড়িতে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিও অবস্থান করছিলেন। তবে সিসি ক্যামেরার ফুটেজে তাকে দেখা যায়নি।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহমেদ পিন্টুর বোন ও মিরপুরের সাবেক কাউন্সিলর সায়েদুর রহমান নিউটনের স্ত্রী। সায়েদুর রহমান নিউটন ২০০২ সালে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.

