আন্তর্জাতিক ডেস্ক
রাশিয়ার বিরুদ্ধে টানা যুদ্ধ চলায় ইউক্রেনের সামরিক কৌশল ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা প্রেসিডেন্টের জন্য অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ফেদোরভকে আকস্মিকভাবে পদচ্যুত করার পর থেকে কিয়েভসহ দেশটির অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। হাজার হাজার সাধারণ নাগরিক ও সমর্থক রাস্তায় নেমে এসে রাজপথ দখল করে নেয় এবং সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। আন্দোলনকারীরা দ্রুত সিরস্কির অপসারণ দাবি করে এবং ফেদোরভকে স্বপদে বা কোনো গুরুত্বপূর্ন পদে পুনর্বহালের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেয়। তারা হুঁশিয়ারি দেয় যে তাদের দাবি মেনে নেওয়া না হলে আন্দোলন আরও কঠোর ও অনিশ্চিত মেয়াদের জন্য প্রসারিত করা হবে। এই জনরোষ ও সম্ভাব্য গৃহসংকট সামাল দিতেই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
মঙ্গলবার রাতে জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া এক বিশেষ টেলিভিশন ভাষণে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট এই গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কথা প্রকাশ্যে আনেন। তিনি জানান, উদ্ভাবনী সামরিক দৃষ্টিভঙ্গি ও জনপ্রিয়তার কারণে জেনারেল মাইখাইলো ড্রাপাতিকে ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর নতুন প্রধান বা কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হচ্ছে। ড্রাপাতির মূল কাজ হবে চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর কমান্ড কাঠামোর আধুনিকায়ন এবং নতুন কৌশলগত পুনর্গঠন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি সামরিক বাহিনীর অপারেশনাল দক্ষতা বাড়াতে এবং রাজপথের তীব্র বিক্ষোভ প্রশমিত করতেই এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
টেলিভিশন ভাষণে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি বিদায়ী সেনাপ্রধান ওলেক্সান্দর সিরস্কির অবদানের কথা গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন এবং তাকে সম্মান জানান। বিশেষ করে যুদ্ধের শুরুর দিকে দেশটির রাজধানী কিয়েভের সফল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পরবর্তীতে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মকালীন সামরিক অভিযানে রাশিয়ার অভ্যন্তরে কুরস্ক প্রদেশে ঐতিহাসিক পাল্টা আক্রমণের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সিরস্কির প্রশংসা করা হয়। উক্ত অভিযানটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথম ঘটনা, যেখানে বিদেশি কোনো বাহিনী সরাসরি রুশ ভূখণ্ডে প্রবেশ করে ট্যাংক ও সামরিক অভিযান চালাতে সক্ষম হয়েছিল।
বিদায়ী সেনাপ্রধানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে প্রেসিডেন্ট বলেন, তাদের যাত্রা ছিল দীর্ঘ ও কঠিন, তবে ইউক্রেনের সার্বিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার লড়াই ধারাবাহিকভাবে অব্যাহত রয়েছে। এই সামরিক অর্জনের পেছনে প্রতিটি সেনাসদস্যের আত্মত্যাগ রয়েছে এবং তারা সর্বোচ্চ সম্মানের দাবিদার। তিনি সিরস্কিসহ যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি লড়াই করা ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিটি সদস্যের আন্তরিক নিষ্ঠার জন্য কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন।
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের যুদ্ধের কৌশল এবং রাজপথের অস্থিতিশীলতা কতটুকু প্রশমিত করতে পারে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সামরিক নেতৃত্বের শীর্ষে ড্রাপাতির মতো নতুন প্রজন্মের জেনারেলের আগমন সেনাদলকে নতুন উদ্দীপনা দিতে পারে। পাশাপাশি জনপ্রিয় রাজনীতিক ও প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব ফেদোরভকে নীতি নির্ধারণে ফের নিয়ে আসা আন্দোলনকারীদের সন্তুষ্ট করতে ভূমিকা রাখতে পারে। রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধ পরিচালনার জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐক্য রক্ষা করা এবং সামরিক নেতৃত্বের সংস্কার নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে কিয়েভের মূল অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।


