বৈশ্বিক হুমকি মোকাবিলায় আসিয়ানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের আহ্বান বাংলাদেশের

বৈশ্বিক হুমকি মোকাবিলায় আসিয়ানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগের আহ্বান বাংলাদেশের

জাতীয় ডেস্ক

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উদীয়মান ও জটিল বৈশ্বিক হুমকিগুলো দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতির সংস্থা (আসিয়ান) এবং ‘ট্রিটি অব অ্যামিটি অ্যান্ড কোঅপারেশন ইন সাউথইস্ট এশিয়া’ (টিএসি)-র সকল সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ যৌথভাবে কাজ করতে অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। বহুমাত্রিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যৌথ আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, অভিন্ন ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং কার্যকর আঞ্চলিক সংকট ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তিনি।

ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির (টিএসি) ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ স্মারক অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সম্প্রতি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ড. খলিলুর রহমানের এই বিশ্বমঞ্চে অংশগ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বিশ্বপরিস্থিতিতে একক কোনো দেশের পক্ষে যেকোনো বৈশ্বিক বা আঞ্চলিক মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভয়াবহ সাইবার আক্রমণ এবং বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহব্যবস্থার স্থবিরতা মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন। ম্যানিলার আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান তাঁর বক্তব্যে ঠিক এই সংকটময় দিকটিই সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান যুগের নতুন ও উদীয়মান সংকটগুলো কাটিয়ে উঠতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে প্রথাগত সম্পর্কের বাইরে গিয়ে বাস্তবসম্মত ও সুসংহত কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

বক্তব্যের একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল আধুনিক প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব নিয়ন্ত্রণ ও দূরদর্শিতার প্রসঙ্গ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-ভিত্তিক সাইবার অপরাধ বৃদ্ধি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিত্তিহীন অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের ভয়াবহ বিস্তার রোধে বাংলাদেশের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশল প্রস্তাব করেন। প্রযুক্তির এই অনিয়ন্ত্রিত রূপ বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে উল্লেখ করে তিনি প্রযুক্তিবান্ধব এবং সুরক্ষিত আঞ্চলিক পরিবেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে, প্রায় পাঁচ দশক আগে আসিয়ান অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা প্রদর্শন এবং একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অসংগত হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে টিএসি চুক্তি সম্পাদিত হয়। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এই বহুজাতিক চুক্তি অনুস্বাক্ষর করে। এর মাধ্যমে আসিয়ানের নীতিভিত্তিক কূটনৈতিক কাঠামোর সাথে সংহতি প্রকাশ করা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান দৃঢ় করে।

সংকট মোকাবিলার কৌশল আলোচনার পাশাপাশি টিএসি সম্মেলনের ফাঁকে ড. খলিলুর রহমান দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তিনি ম্যানিলায় অবস্থানকালে চিলি, নেদারল্যান্ডস ও ফিলিপাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কাতারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সাথে পৃথক বহুমাত্রিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন।

এসব বৈঠকে পারস্পরিক উন্নয়ন ও কৌশলগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয় স্থান পায়। বিশেষ করে মুক্ত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, টেকসই পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, বৈধ ও নিরাপদ অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং সার্কুলার অর্থনীতি বা বৃত্তাকার অর্থনীতির প্রয়োগ বাড়ানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বর্তমানে ৩৩তম আসিয়ান রিজিওনাল ফোরামের (এআরএফ) পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক এবং টিএসি চুক্তির স্বর্ণজয়ন্তী উদযাপনের আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে ফিলিপাইনে অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার এবং আসিয়ানভুক্ত পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সামঞ্জস্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই সক্রিয় অংশগ্রহণ অত্যন্ত তাত্পর্যপূর্ণ।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ