জাতীয় ডেস্ক
বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রতিরোধব্যবস্থা জোরদার করা, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ নির্ণয় এবং সহজলভ্য চিকিৎসা সুনিশ্চিত করার মাধ্যমে একটি হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমন্বিত ও ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বিশেষ বাণীতে তিনি এ আহ্বান জানান। বর্তমান সরকার বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার পরিধি বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবা প্রসার এবং বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা-নিরাপত্তা নিশ্চিতে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন যুগান্তকারী পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতিবছর ২৮ জুলাই যথাযোগ্য মর্যাদা ও সচেতনতামূলক নানাবিধ কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বিশ্ব হেপাটাইটিস দিবস পালিত হয়ে আসছে। এ বছর দিবসটির বৈশ্বিক প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—’চলুন সহজভাবে বুঝি’। দিবসটির এবারের মূল ভাবনার ওপর আলোকপাত করে প্রধানমন্ত্রী জানান, এই প্রতিপাদ্যের প্রধান লক্ষ্যই হলো হেপাটাইটিস সংক্রান্ত প্রচলিত সামাজিক কুসংস্কার ও ভুল ধারণা দূর করে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করা। একইসঙ্গে এই রোগ ঘিরে তৈরি হওয়া সামাজিক প্রতিবন্ধকতা ও ভীতি দূর করে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, নিয়মিত পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা সর্বস্তরের জনগণের জন্য সহজ ও নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
লিভার সংক্রান্ত রোগের বিশ্বব্যাপী ভয়াবহতা ও এর প্রতিরোধযোগ্যতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বাণীতে বলা হয়, হেপাটাইটিস বর্তমানে অন্যতম প্রধান জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। বিশ্বজুড়ে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষ হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পরবর্তী সময়ে লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের মতো প্রাণঘাতী জটিলতায় ভোগেন। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে সময়মতো টিকাদান, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতন ও নিরাপদ জীবনযাপন এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে এ রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সেই লক্ষ্যে সার্বিক হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও রোগীদের সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে যেসব সামাজিক ও কাঠামোগত বাধা রয়েছে, তা দ্রুত অপসারণ করা সময়ের প্রধান দাবি।
দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামোর মানোন্নয়ন ও সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা তুলে ধরে বাণীতে জানানো হয়, ঢাকার বাইরে বিভিন্ন অঞ্চলেও লিভার রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসা, আধুনিক রোগ নির্ণয় সুবিধা এবং অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ জোরদার করা হচ্ছে। রাজধানীর ন্যাশনাল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট অ্যান্ড হাসপাতালসহ অন্যান্য বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে বিশ্বমানের আধুনিক চিকিৎসা-সরঞ্জাম সংযোজন করা হয়েছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ চিকিৎসাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী হবে এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য নাগরিকদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা অনেকাংশে হ্রাস পাবে। পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে বিপন্ন লিভার সিরোসিস ও ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের সহায়তায় সরকারিভাবে এককালীন সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক অনুদান প্রদান অব্যাহত রাখা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতকে পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে সরকারের নতুন দূরদর্শী পরিকল্পনার কথা বাণীতে উঠে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যসেবাকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত করতে সরকার ‘ই-হেলথ কার্ড’ এবং সমন্বিত রোগী তথ্য ব্যবস্থাপনা (ইনটিগ্রেটেড পেশেন্ট ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম) চালুর কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। এই প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগীর স্বাস্থ্যজনিত তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণ, দ্রুত ও নির্ভুল রোগ নির্ণয়, নিরবচ্ছিন্ন ধারাবাহিক চিকিৎসা প্রদান এবং সরকারি সহায়তা বিতরণ আরও স্বচ্ছ ও সহজ হবে। এর ফলে হেপাটাইটিসসহ অন্যান্য সংক্রামক ও দীর্ঘমেয়াদি রোগের প্রতিরোধ, আধুনিক চিকিৎসা এবং ফলোআপ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা অভূতপূর্ব অগ্রগতি লাভ করবে।
জনস্বাস্থ্য রক্ষায় বর্তমান সরকারের নীতিগত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি উল্লেখ করেন, ‘প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম’—এই মূলনীতিকে সামনে রেখে দেশের প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দেশের ইতিহাসে স্বাস্থ্য খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ প্রদান, লিভার চিকিৎসার আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা, প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামোর বিস্তার এবং নাগরিকবান্ধব সেবার মাধ্যমে একটি সুস্থ, নিরাপদ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রার বিষয়ে আলোকপাত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) নির্ধারিত ২০৩০ সালের মধ্যে ভাইরাল হেপাটাইটিস নির্মূলের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ পূর্ণ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বৈশ্বিক লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, অলাভজনক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সমাজের সর্বস্তরের জনগণের যৌথ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। সকলের সম্মিলিত ও নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ভাইরাল হেপাটাইটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনের মাধ্যমে একটি সুস্থ, সমৃদ্ধ ও হেপাটাইটিসমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।


