জাতীয় সংসদ ও নির্বাচন ডেস্ক
দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি, আইনগত পদক্ষেপ ও সামগ্রিক কর্মপরিকল্পনা সমন্বয়ের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মঙ্গলবার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ ভবনে ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের কার্যালয়ে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি শুরু হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে নির্বাচন কমিশনের একটি প্রতিনিধিদল বৈঠকে অংশগ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার পর সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। এই লক্ষ্যে নির্বাচনের তপশিল রূপরেখা চূড়ান্তকরণ, ভোটগ্রহণের সম্ভাব্য তারিখ ও সময় নির্ধারণ এবং সংসদ সচিবালয়ের সার্বিক সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা করতেই এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা ও সংসদীয় পরিবেশ পর্যালোচনার ভিত্তিতে খুব দ্রুতই আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হবে।
সম্প্রতি দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করার ফলে রাষ্ট্রপতির পদটি শূন্য হয়। গত ২৪ জুলাই শুক্রবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত প্রকাশ করেন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০(৩) অনুচ্ছেদের বিধান মেনে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের উদ্দেশে স্বহস্তে লিখিত ও স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র জমা দেন। সংবিধানের নিয়ম অনুযায়ী উক্ত পদত্যাগপত্র গ্রহণের পরপরই রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হিসেবে গণ্য হয়।
রাষ্ট্রপতির পদ খালি হওয়ার পর সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ ও ৭৪(৩) অনুচ্ছেদের আলোকে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব হস্তান্তর সম্পন্ন করা হয়। এর অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ দেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির পদভার গ্রহণ করেন। অন্যদিকে, সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই অন্তর্বর্তীকালীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনায় আইনগত ধারাবাহিকতা অটুট থাকে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৩(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে, মৃত্যুবরণ করলে কিংবা অপসারিত হলে পদটি শূন্য হওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সাংবিধানিক এই সময়সীমা মেনে চলা বাধ্যতামূলক হওয়ায় নির্বাচন কমিশন দ্রুত প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে। সংবিধানের ১১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১-এর আইনি কাঠামো অনুসরণে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রেখে নির্বাচনের চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণের এখতিয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অধীনস্থ কমিশনের।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ব্যবস্থা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির পদটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সম্মানজনক পদ। সংবিধানের ৪৮(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে জাতীয় সংসদের আইনপ্রণেতা অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়ে থাকেন। নির্ধারিত তফসিলে প্রার্থীর মনোনয়নপত্র আহ্বান, দাখিল, মূলবাছাই ও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট দিন উল্লেখ থাকে। একাধিক বৈধ প্রার্থী থাকলে সংসদে নির্ধারিত দিনে গোপন ব্যালট বা সরাসরি ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। আর একক বৈধ প্রার্থী থাকলে নির্বাচন আইন অনুযায়ী তাঁকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।
সংবিধানের ৫০(১) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট উল্লেখ অনুযায়ী, নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতির মেয়াদ হবে দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে পরবর্তী পূর্ণ পাঁচ বছর। অর্থাৎ, পদত্যাগের ফলে সৃষ্ট মেয়াদের কেবল অবশিষ্ট অংশ নয়, বরং নবনির্বাচিত ২৩তম রাষ্ট্রপতি সম্পূর্ণ মেয়াদের জন্যই রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব পালন করবেন।
ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দপ্তরে অনুষ্ঠিত আজকের এই বৈঠকটিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরুর প্রধান ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই বৈঠক সমাপ্তির পর নির্বাচন কমিশন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের তপশিল প্রকাশ কিংবা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত তথ্য জানানো হতে পারে। এই নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হলে দেশের সাংবিধানিক কাঠামোর চূড়ান্ত পূর্ণতা আসার পাশাপাশি শাসনতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অধিকতর স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে বলে মনে করছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।


