মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অস্কারজয়ী আয়ারল্যান্ডের সংগীতশিল্পী গ্লেন হ্যানসার্ডের মৃত্যু

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় অস্কারজয়ী আয়ারল্যান্ডের সংগীতশিল্পী গ্লেন হ্যানসার্ডের মৃত্যু

বিনোদন ডেস্ক

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মারা গেছেন বিশ্বখ্যাত অস্কারজয়ী আইরিশ সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও অভিনেতা গ্লেন হ্যানসার্ড। গত বুধবার ভোরে আয়ারল্যান্ডের রাজধানী ডাবলিনে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে এই খ্যাতিমান শিল্পীর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর। তিনি স্ত্রী মাইরে সারিটসা এবং তিন বছর বয়সী একমাত্র সন্তান ক্রিস্টিসহ অসংখ্য অনুরাগী রেখে গেছেন।

শিল্পী গ্লেন হ্যানসার্ডের দীর্ঘদিনের ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘এটিসি ম্যানেজমেন্ট’ এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে তাঁর প্রয়াণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। স্থানীয় আইরিশ পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, ডাবলিনের পশ্চিমাঞ্চলীয় একটি সড়কে গ্লেন হ্যানসার্ডের মোটরসাইকেলটি একক দুর্ঘটনার শিকার হয়। বুধবার স্থানীয় সময় ভোর চারটা ৩০ মিনিটের দিকে জরুরি সেবা সংস্থাকে খবর দেওয়া হলে তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। সেখানে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে প্রাথামিক চিকিৎসা প্রদান করা হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই দায়িত্বরত চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

আন্তর্জাতিক সংগীত অঙ্গনে গ্লেন হ্যানসার্ড ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত ও পরিচিত এক ব্যক্তিত্ব। ১৯৯০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি গঠন করেন জনপ্রিয় আইরিশ রক ব্যান্ড ‘দ্য ফ্রেমস’। ব্যান্ডের প্রধান কণ্ঠশিল্পী ও প্রথামক শিল্পী হিসেবে তিনি দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হন। পরবর্তীতে একক শিল্পী হিসেবেও তিনি একাধিক সংগীত অ্যালবাম প্রকাশ করেন, যার মধ্যে ২০১৬ সালে প্রকাশিত তাঁর কাজ মর্যাদাপূর্ণ গ্র্যামি পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল।

তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তাঁর সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ২০০৮ সালে। স্বাধীনধারার আইরিশ চলচ্চিত্র ‘ওয়ানস’-এ অভিনয় এবং এর সুর ও সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে তিনি বিশ্বমঞ্চে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান। এই সিনেমায় অস্কারজয়ী শিল্পী মার্কেটা ইরগ্লোভার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করেন হ্যানসার্ড। পরবর্তী সময়ে তাঁরা দুজন মিলে গঠন করেন জনপ্রিয় সংগীত জুটি ‘দ্য সোয়েল সিজন’। ‘ওয়ানস’ চলচ্চিত্রের সর্বকালের অন্যতম সাড়া জাগানো গান ‘ফলিং স্লোলি’-র জন্য ২০০৮ সালে ৮০তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসে (অস্কার) ‘সেরা মৌলিক গান’ বিভাগে পুরস্কার অর্জন করেন গ্লেন হ্যানসার্ড। অস্কার জয়ের পর এই চলচ্চিত্রের গানগুলো অবলম্বনে নির্মিত ব্রডওয়ে মঞ্চনাটকটি ২০১২ সালে মর্যাদাপূর্ণ আটটি টনি পুরস্কার জয় করে। অস্কারের পাশাপাশি ১৯৯১ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দ্য কমিটমেন্টস’-এ একজন ব্যান্ড সদস্যের চরিত্রে অভিনয় করেও তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন।

সংগীতের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমে গ্লেন হ্যানসার্ডের অবদান ছিল অপরিসীম। ডাবলিনের গৃহহীন ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সহায়তায় তিনি জীবনের দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করেছেন। বিশেষ করে ২০১০ সালে আয়ারল্যান্ডে তীব্র অর্থনৈতিক সংকট চলাকালে বড়দিনের আগের রাতে তিনি ডাবলিনের রাজপথে উন্মুক্ত কনসার্ট বা পথসংগীতের ধারা চালু করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বিখ্যাত দাতব্য প্রতিষ্ঠান ‘ডাবলিন সাইমন কমিউনিটি’-র জন্য ২০ লাখ ইউরোর বেশি তহবিল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছিল। এই মহতি উদ্যোগে প্রতি বছর আয়ারল্যান্ড ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনের তারকা শিল্পী বোনো, সিনেড ও’কনর এবং শেন ম্যাকগোয়ানের মতো খ্যাতিমান ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করতেন। তাঁর মৃত্যুর পর ডাবলিন সাইমন কমিউনিটি এক শোকবার্তায় তাঁকে ‘গৃহহীনতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক অবিচল মহীরুহ’ হিসেবে অভিহিত করেছে।

গ্লেন হ্যানসার্ডের আকস্মিক ও অকাল প্রয়াণে আয়ারল্যান্ডসহ বিশ্বসংগীত জগতে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আয়ারল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন এক শোকবার্তায় বলেন, গ্লেন হ্যানসার্ড এমন একজন ব্যতিক্রমী শিল্পী ছিলেন, যিনি আয়ারল্যান্ডের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অঙ্গনে চিরস্মরণীয় অবদান রেখে গেছেন। সংগীত অঙ্গনের সহকর্মীরাও তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন। বিখ্যাত মার্কিন সংগীতশিল্পী ব্রুস স্প্রিংস্টিন শোক প্রকাশ করে বলেন, বিশ্ব একজন মহান সংগীতশিল্পী, উদার হৃদয়ের মানুষ ও খাঁটি বন্ধুকে হারাল। এছাড়া আইরিশ ব্যান্ড ‘ইউ টু’ (U2)-এর প্রধান কণ্ঠশিল্পী বোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, গ্লেন ছিলেন সেই বিরল মানুষদের একজন, যিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টে সর্বদা হাসিমুখে পাশে দাঁড়াতেন এবং রাজপথের খেটে খাওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে আজীবন কাজ করে গেছেন।

বিনোদন শীর্ষ সংবাদ