জাপানে স্থানীয় নাগরিক সংখ্যা কমে ১২ কোটির নিচে, তীব্র হচ্ছে জনসংখ্যা সংকট

জাপানে স্থানীয় নাগরিক সংখ্যা কমে ১২ কোটির নিচে, তীব্র হচ্ছে জনসংখ্যা সংকট

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জাপানে দীর্ঘদিনের নিম্ন জন্মহার ও দ্রুত বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির অভিঘাতে ঐতিহাসিক পতন ঘটেছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয়ক ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক তথ্যানুসারে, গত ৪২ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো জাপানে বসবাসকারী মূল নাগরিকের সংখ্যা কমে ১২ কোটির নিচে নেমে এসেছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রশাসনিক নিবন্ধনের ভিত্তিতে দেখা যায়, দেশটিতে জাপানি নাগরিকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১ কোটি ৯৭ লাখ ৩৬ হাজার ৪৮৩ জনে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯ লাখ ১৭ হাজারের বেশি কম। ১৯৬৮ সালে জনসংখ্যাসংক্রান্ত পদ্ধতিগত তথ্য সংরক্ষণ শুরুর পর থেকে এক বছরে মূল নাগরিক হ্রাসের এটিই সর্বোচ্চ রেকর্ড।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সালে জাপানের স্থানীয় জনসংখ্যা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল। তবে এর পর থেকে টানা ১৭ বছর ধরে দেশটির জাপানি নাগরিকদের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পেয়ে আসছে। বিপরীতে, দেশের ভেতরের তীব্র শ্রম সংকট মেটাতে বিদেশী নাগরিকদের ওপর ক্রমবর্ধমান নির্ভরতার কারণে প্রবাসীদের উপস্থিতি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০১৩ সালে বিদেশী বাসিন্দাদের নিবন্ধিত হিসাব শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম তাদের সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত হলো। দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী ও বিদেশী বাসিন্দাদের অন্তর্ভুক্ত করলে জাপানের সর্বমোট জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১২ কোটি ৩৭ লাখ ৬৭ হাজার ৬৪২ জন, যার মধ্যে বিদেশী নাগরিকের সংখ্যা ৪০ লাখ অতিক্রম করেছে।

বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে প্রবীণ জনসংখ্যার দেশের তালিকায় মোনাকোর পরই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপান। বর্তমানে জাপানের জনগণের মধ্যম বয়স (মিডিয়ান এইজ) ৪৯.৯ বছর। তরুণ প্রজন্মের তুলনায় প্রবীণদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি প্রজনন হ্রাসের প্রবণতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। দেশটির সরকারি তথ্যানুসারে, ২০২৫ সালে জাপানের মোট প্রজনন হার (টোটাল ফার্টিলিটি রেট) নেমে এসেছে রেকর্ড সর্বনিম্ন ১.১৪-এ। অর্থাৎ, একজন নারী তাঁর প্রজননক্ষম বয়সে গড়ে মাত্র ১.১৪টি সন্তানের জন্ম দিচ্ছেন, যা টানা দশম বছরের মতো প্রজনন হার হ্রাসের ধারাবাহিকতাকে চিহ্নিত করে।

একই সময়ে দেশটিতে এক বছরে জন্মগ্রহণকারী শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বছরজুড়ে জন্ম নিয়েছিল মাত্র ৬ লাখ ৭০ হাজারের কিছু বেশি শিশু, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার কম। ১৮৯৯ সালে জন্ম সংক্রান্ত প্রশাসনিক হিসাব রাখা শুরুর পর থেকে এক বছরে এটিই সর্বনিম্ন শিশু জন্মের ঘটনা।

জনসংখ্যা কাঠামোয় এই পরিবর্তনের ফলে জাপানের অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় কারখানা, সেবা খাত এবং কৃষি ক্ষেত্রে তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী কমে যাওয়ার কারণে সরকারের আয়কর বা সামাজিক নিরাপত্তা কর থেকে আসা রাজস্ব আয় হ্রাস পাচ্ছে, অথচ প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষায় সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে। এটি জাপানের সার্বিক রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর চরম মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

এই বিপর্যয় সামাল দিতে ও নতুন পরিবার গঠনে তরুণ সমাজকে উৎসাহিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনী পদক্ষেপও গ্রহণ করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে টোকিও মহানগর সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ম্যাচমেকিং অ্যাপ ‘টোকিও এনমুসুবি’ চালু করে। সামাজিক এক সমীক্ষায় দেখা গিয়েছিল, বিয়েতে আগ্রহী প্রায় ৭০ শতাংশ তরুণ-তরুণী কোনো ধরনের সক্রিয় উদ্যোগ নিচ্ছেন না। সেই স্থবিরতা কাটানোর লক্ষ্যে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন প্রক্রিয়া কঠোর রাখা হয়েছে, যেখানে আবেদনকারীদের আইনিভাবে অবিবাহিত থাকার প্রশাসনিক সনদ ও অনলাইন সাক্ষাৎকার পার হতে হয়।

চলতি বছরের মধ্যভাগ পর্যন্ত অ্যাপটিতে আবেদনকারী ৩৬ হাজার প্রার্থীর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১৬ হাজার প্রার্থীকে নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। সরকারি হিসাবমতে, এই প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৭৬০টি জোড় আন্তরিক সম্পর্কে যুক্ত রয়েছেন এবং ইতোমধ্যে ২৬৫টি দম্পতি সফলভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।

প্রযুক্তিগত উদ্যোগ ও বিদেশী শ্রমিক নীতিতে কিছু ছাড় দেওয়া সত্ত্বেও জাপানের জনসংখ্যা হ্রাসের দীর্ঘমেয়াদী অভিঘাত সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। অর্থনৈতিক স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে কর্মক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা, শিশু প্রতিপালন ব্যয় কমানো এবং তরুণ প্রজন্মের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে আরও গভীর নীতিগত সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ