আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের অবস্থান থেকে সাময়িকভাবে সরে আসার কথা ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং দ্রুত একটি সার্বিক সমঝোতা চুক্তিতে পৌঁছানোর শর্তে এই সামরিক পদক্ষেপ স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন তিনি। প্রস্তাবিত এই চুক্তির প্রাথমিক কাঠামোর মধ্যে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক জলপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখা এবং ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম সংক্রান্ত নিরাপত্তা উদ্বেগ নিরসনের শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক শান্তি ও ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব এবং একটি স্থিতিশীল আঞ্চলিক পরিবেশের স্বার্থে এই সামরিক পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, এই সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণভাবে উভয় পক্ষের মধ্যে দ্রুত একটি কার্যকরী ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের ওপর নির্ভর করছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী যেকোনো পরিস্থিতির জন্য সামরিকভাবে সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিল। একই সঙ্গে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলের বর্তমান পরিস্থিতি ও নতুন চুক্তি সম্পাদনের কূটনৈতিক উদ্যোগে মিত্র দেশ ইসরায়েলও সমর্থন প্রকাশ করেছে।
মার্কিন সরকারের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার আগেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তীব্র সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে সম্ভাব্য মার্কিন অভিযানের খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই অঞ্চলের মূল নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। সম্ভাব্য মার্কিন আক্রমণের জবাবে তেহরানও ইসরায়েলি ভূখণ্ড বা আঞ্চলিক কৌশলগত অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা আঘাত হানতে পারে—এমন প্রবল আশঙ্কায় ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়। সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা ছিল, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা যেকোনো সময় সামরিক নির্দেশনার মাধ্যমে ইরানের জ্বালানি কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে আঘাত হানতে পারে, যার কারণে সামরিক বাহিনীকে উচ্চ প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছিল।
অন্যদিকে, সম্ভাব্য আক্রমণের বিপরীতে তেহরানের পক্ষ থেকেও কঠোর পাল্টা ব্যবস্থার তীব্র হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। যেকোনো প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে কিংবা ওয়াশিংটনকে আঞ্চলিক কোনো দেশ তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারে সুবিধা প্রদান করলে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে বলে সতর্ক বার্তা দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ অঞ্চলে নতুন করে পূর্ণমাত্রার সংঘাত বৃদ্ধি পেলে তা কেবল সংশ্লিষ্ট দুটি দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত না, বরং সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিত। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মূল জ্বালানি পরিকাঠামো হুমকির মুখে পড়লে এবং বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল বিঘ্নিত হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সংকট তীব্র আকার ধারণ করার ঝুঁকি ছিল।
এই ধরনের সার্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে মার্কিন সরকারের পক্ষ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত তাদের নাগরিকদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা নির্দেশিকা জারি করা হয়েছিল। যেকোনো মুহূর্তে আকাশসীমা বন্ধ, বেসামরিক বিমান চলাচল স্থগিত বা আঞ্চলিক পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকে নাগরিকদের সতর্ক থাকার এবং প্রয়োজনে এলাকা ত্যাগের প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়। একই সাথে আঞ্চলিক প্রভাব বজায় রাখা কয়েকটি মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সংঘাত এড়াতে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার করে। সংঘাতের পথ পরিহার করে সংকট নিরসনে আলোচনার গুরুত্ব তুলে ধরে মধ্যস্থতা অব্যাহত রাখার ফলেই সামরিক পদক্ষেপ স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ত্বরান্বিত হয়।
মার্কিন প্রশাসনের এই পদক্ষেপে তাৎক্ষণিকভাবে সামরিক উত্তেজনার পারদ কিছুটা হ্রাস পেলেও টেকসই সমাধানের বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত। আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক আইন ও দ্বিপক্ষীয় শর্তাবলি মেনে উভয় পক্ষ কতটা দ্রুত আলোচনা সম্পন্ন করতে পারে, তার ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক স্থিতিশীলতা। বিশ্ব সম্প্রদায় বর্তমানে দুই দেশের মধ্যকার পরবর্তী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অগ্রগতির দিকে নিবিড় নজর রাখছে।


