আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরাক থেকে অবশিষ্ট সব সামরিক সদস্য প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে এই সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে। এর মাধ্যমে ২০০৩ সালে সামরিক আগ্রাসনের মাধ্যমে শুরু হওয়া দুই দশকেরও বেশি সময়ের মার্কিন সামরিক উপস্থিতির চূড়ান্ত অবসান ঘটতে যাচ্ছে।
বাগদাদে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপারের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত জঙ্গি গোষ্ঠী আইসিসের বিরুদ্ধে গঠিত আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হবে। ওয়াশিংটনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও মার্কিন বাহিনীর এই পরিকল্পিত প্রত্যাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র গত বছরই ইরাকের অধিকাংশ প্রধান সামরিক ঘাঁটি থেকে তাদের সৈন্য সরিয়ে নেয়। তবে দেশটির উত্তর সামরিক অঞ্চলের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দিস্তানে একটি সংক্ষিপ্ত উপস্থিতি ধরে রেখেছিল। কুর্দিস্তানের দুজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রায় তিন সপ্তাহ আগে থেকেই এরবিল সামরিক ঘাঁটি থেকে মার্কিন কর্মী ও প্রয়োজনীয় সামরিক সরঞ্জাম স্থানান্তর শুরু হয়েছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০৩ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের নির্দেশে তথাকথিত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের খোঁজে ইরাকে হামলা চালায় যৌথ বাহিনী। এর পর থেকে ইরাকের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও নিরাপত্তার মূল নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে ওয়াশিংটন। ২০০৭ সালে বিদ্রোহ দমন অভিযানের চরম পর্যায়ে ইরাকে সর্বোচ্চ ১ লাখ ৭০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১১ সালে তৎকালীন বারাক ওবামা প্রশাসন প্রথম দফায় সব যুদ্ধরত সেনা প্রত্যাহার করে নেয়।
তবে ২০১৪ সালে উগ্রপন্থী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএসের আকস্মিক উত্থান ও ইরাকের বিশাল ভূখণ্ড দখলের প্রেক্ষাপটে ইরাক সরকারের আনুষ্ঠানিক অনুরোধে আবারও মার্কিন বাহিনী সেখানে প্রবেশ করে। ২০২১ সালে আইএসআইএসের ভূখণ্ডভিত্তিক পরাজয় নিশ্চিত হওয়ার পর মার্কিন বাহিনী তাদের সরাসরি যুদ্ধ অভিযান শেষ করে এবং কেবল প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সন্ত্রাসবিরোধী সহায়তার জন্য প্রায় ২,৫০০ সেনা রেখে দেয়। ৩০ সেপ্টেম্বরের পদক্ষেপটি সেই অবশিষ্টাংশের চূড়ান্ত বিদায় নিশ্চিত করবে।
বিদেশি সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার সাথে সাথে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুসংহত করতে নতুন পদেক্ষেপ নিয়েছে বাগদাদ। প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি দেশটির অভ্যন্তরে সক্রিয় বিভিন্ন অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র ও মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সমর্পণের জন্য আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছেন। তিনি জানান, বিদেশি সেনা চলে যাওয়ার পর দেশের অভ্যন্তরে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বাইরে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর আলাদা অস্ত্র ধরে রাখার আইনি বা রাজনৈতিক কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।
তবে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে বড় ধরনের নিরাপত্তা সংশয় রয়েছে। ইরাকের বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী ও শক্তিশালী ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠী ইতিমধ্যেই সরকারের এই অস্ত্র ত্যাগের প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। সামরিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, মার্কিন সেনামুক্ত ইরাকে এই সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিরস্ত্র করার প্রচেষ্টা থেকে নতুন করে দীর্ঘমেয়াদী অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।


