আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান চো তায়ে-ইয়ংয়ের কারাদণ্ডের মেয়াদ ১৮ মাস থেকে বাড়িয়ে আড়াই বছর (৩০ মাস) করেছেন দেশটির একটি আপিল আদালত। ২০২৪ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওলের বিতর্কিত ও ব্যর্থ সামরিক আইন জারির প্রচেষ্টার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মামলায় এই রায় ঘোষণা করা হয়। সিউল হাইকোর্ট রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা লঙ্ঘন এবং মিথ্যা বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তাকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন।
আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, সামরিক আইন জারির দিনই আইনপ্রণেতা ও রাজনীতিকদের আটকের নির্দেশের বিষয়ে চো তায়ে-ইয়ংকে অবহিত করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও ঘটনার কয়েক দিন পর তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন যে রাজনীতিকদের গ্রেপ্তারের কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। আদালতের মতে, বাস্তব তথ্য গোপন করে এমন অসত্য বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে তিনি সরাসরি তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের বাইরে গিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন।
দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনআইএস) সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনে সংস্থার কর্মকর্তা ও প্রধানদের যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আদালতের রায়ে উল্লেখ করা হয়, রাষ্ট্রীয় একটি স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংস্থার শীর্ষ পদে থেকে রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে এমন মিথ্যা তথ্য প্রচার করা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এর আগে নিম্ন আদালত মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগে চো তায়ে-ইয়ংকে ১৮ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন। তবে নিম্ন আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে বিশেষ কৌঁসুলির কার্যালয় থেকে আপিল করা হয়, যেখানে তার বিরুদ্ধে সাত বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানানো হয়েছিল। রাষ্ট্রপক্ষের সেই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সিউল হাইকোর্ট সার্বিক পরিস্থিতি ও আইনের ব্যত্যয় বিবেচনা করে তার সাজার মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে আড়াই বছর নির্ধারণ করেন।
অবশ্য প্রসিকিউশনের আনা সব অভিযোগে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। বিশেষ করে দায়িত্ব অবহেলার যে অভিযোগটি তোলা হয়েছিল, তা থেকে আপিল আদালত তাকে অব্যাহতি দিয়েছেন। অভিযোগ ছিল, সামরিক আইনের আওতায় রাজনীতিকদের আটকের পরিকল্পনার বিষয়টি জানার পরও তিনি তা তাৎক্ষণিকভাবে জাতীয় সংসদকে অবহিত করেননি। তবে আদালত রায়ে উল্লেখ করেন, তৎকালীন পরিস্থিতিতে সংসদকে বিষয়টি জানানো তার জন্য আইনিভাবে বাধ্যতামূলক ছিল কি না, তা অকাট্যভাবে প্রমাণ করা কঠিন। ফলে এই নির্দিষ্ট অভিযোগের দায় থেকে তাকে মুক্ত রাখা হয়।
২০২৪ সালের শেষভাগে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইউন সুক-ইওল কর্তৃক আকস্মিক সামরিক আইন জারির পদক্ষেপ দক্ষিণ কোরিয়ার রাজনীতিতে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও সাংবিধানিক সংকটের জন্ম দিয়েছিল। পার্লামেন্টের হস্তক্ষেপে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই সামরিক আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় প্রশাসন। পরবর্তীতে এই ব্যর্থ পদক্ষেপের জের ধরে শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা শুরু হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাবেক গোয়েন্দাপ্রধানের এই বর্ধিত সাজা দক্ষিণ কোরিয়ার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নজির হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কাঠামোর শীর্ষ কর্তারা যেন আইন ও নিরপেক্ষতার ঊর্ধ্বে অবস্থান না করেন, আদালতের এই সিদ্ধান্ত সেই বার্তাটিকেই সুদৃঢ় করল।


