জাতীয় ডেস্ক
দেশে চলমান হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই থেকে তিন মাস সময় লাগবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত। তিনি উল্লেখ করেন, দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকট দ্রুত দূর করা সম্ভব নয়; তবে এই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংক্রমণের বিস্তার রোধ, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণ এবং শিশু মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে সরকার।
বুধবার রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে শিশুদের হাম সংক্রান্ত একটি যৌথ গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক বাস্তবতা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ সাধারণ মানুষ সরকারি চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার কারণে এই খাত কাঠামোগত দুর্বলতার সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর ব্যাপক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠলেও সেখানে মুনাফা অর্জনের প্রবণতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, হলি ফ্যামিলি বা বারডেমের মতো স্বায়ত্তশাসিত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ও বেসরকারি ব্যবস্থার মধ্যে ইতিবাচক সেবামূলক ভারসাম্য বজায় রাখছে।
শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভবিষ্যৎ সরকারি পদক্ষেপের রূপরেখা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী জানান, শিশুদের উন্নত ও বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা প্রান্তিক পর্যায়ে পৌঁছে দিতে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে দেশের পাঁচটি বিভাগীয় শহরে পাঁচটি পূর্ণাঙ্গ শিশু হাসপাতাল পুরোপুরি তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত জনবল সংকট কাটাতে দ্রুততম সময়ে পাঁচ হাজার চিকিৎসক, এক হাজার নার্স এবং এক লাখ নতুন স্বাস্থ্য মাঠকর্মী নিয়োগের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এবং আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর যৌথ পরিচালনায় শিশুদের হাম সংক্রান্ত গবেষণার মূল ফলাফল প্রকাশ করা হয়। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের ৬৫ শতাংশই অপুষ্টির শিকার। এদের মধ্যে ১২ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে এবং ৫৩ শতাংশ শিশু মাঝারি ধরনের অপুষ্টিতে ভুগছিল।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুদের ৪৩ শতাংশের বয়স তিন থেকে নয় মাসের মধ্যে। হামে আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে ৩৮ শতাংশ জন্মের পর প্রথম ছয় মাস মায়ের বুকের দুধ পায়নি। তবে এই রোগে মারা যাওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল আশঙ্কাজনকভাবে বেশি—প্রায় ৮২ শতাংশ। অর্থাৎ, হামে মৃত্যুবরণ করা শিশুদের একটি বড় অংশ শৈশবের শুরুতে মায়ের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।
এ ছাড়া গবেষণার উপাত্তে জানা যায়, নিয়মিত টিকা পাওয়ার নির্ধারিত বয়স হয়নি—এমন নয় মাসের কম বয়সি শিশুদের মধ্যে ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশের শরীরে হামের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। অন্যদিকে, টিকা গ্রহণের বয়স হওয়া সত্ত্বেও যারা কোনো ডোজ গ্রহণ করেনি, তাদের মধ্যে ৯৭ শতাংশ হামে আক্রান্ত হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা এবং শিশু পুষ্টি নিশ্চিত না করা গেলে এই ধরনের সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো কঠিন হবে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হকের সভাপতিত্বে সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, পরিচালক মো. নুরুল ইসলাম এবং সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক কাজী আহমেদ জাকী। অনুষ্ঠানে গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম এবং আইসিডিডিআর,বির জ্যেষ্ঠ পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান।


