আশুলিয়ায় তালাবদ্ধ কক্ষে রাজমিস্ত্রি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন, খুলনায় গ্রেপ্তার ১

আশুলিয়ায় তালাবদ্ধ কক্ষে রাজমিস্ত্রি হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন, খুলনায় গ্রেপ্তার ১

অপরাধ ডেস্ক
ঢাকার সাভারের আশুলিয়ায় একটি ভাড়া করা তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। হত্যাকাণ্ডের মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রধান অভিযুক্তকে খুলনা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রক্তমাখা ছুরি ও নিহতের খোয়া যাওয়া মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম আল-আমিন (৩৬)। তিনি নিহত কামরুল খানের (৪৪) পূর্বপরিচিত এবং দুজনই খুলনার তেরখাদা উপজেলার বাসিন্দা।
সোমবার পিবিআই ঢাকা জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন জেলা পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ।
সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই জানায়, গত ১৬ আগস্ট আশুলিয়া থানার বাসাইদ এলাকার একটি টিনশেড বাড়ির তালাবদ্ধ কক্ষ থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকলে স্থানীয় বাসিন্দারা আশুলিয়া থানায় খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে কক্ষের তালা ভেঙে ভেতর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক পুরুষের গলিত মরদেহ উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
মরদেহ উদ্ধারের পর পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ছায়াতদন্ত শুরু করে। আধুনিক ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ডেটাবেজের সহায়তায় নিহতের আঙুলের ছাপ মিলিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। নিশ্চিত হওয়া যায় যে, নিহত ব্যক্তির নাম কামরুল খান এবং তাঁর বাড়ি খুলনার তেরখাদা উপজেলায়।
এ ঘটনায় নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে আশুলিয়া থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। পরে পিবিআই ঢাকা জেলা আনুষ্ঠানিকভাবে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে।
তদন্তের অগ্রগতি তুলে ধরে পুলিশ সুপার জানান, ঘটনার তদন্তভার গ্রহণের পর তদন্ত দল আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে অভিযুক্তের গতিবিধি ট্র্যাক করা শুরু করে। নিহতের মোবাইল ফোনের সর্বশেষ অবস্থান ও সন্দেহভাজনদের কল ডিটেইলস রেকর্ড (সিডিআর) পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে আল-আমিনের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়া যায়।
পরবর্তীতে পিবিআই ঢাকা জেলার একটি বিশেষ দল খুলনা জেলা পিবিআইয়ের সহায়তায় খুলনার তেরখাদা উপজেলার নয়া বারাসাত গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে আল-আমিনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের সময় তার হেফাজত থেকে নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা হয়। পরে আসামির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী আশুলিয়ার সেই ভাড়া বাসার বাথরুমের কমোড থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ধারালো ছুরিটি উদ্ধার করে জব্দ তালিকাভুক্ত করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তির বরাতে পিবিআই জানায়, নিহত কামরুল ও অভিযুক্ত আল-আমিন কাজের সন্ধানে গত ৮ আগস্ট খুলনা থেকে আশুলিয়ায় আসেন। তাঁরা বাসাইদ এলাকার ওই টিনশেড কক্ষটি ভাড়া নিয়ে স্থানীয়ভাবে রাজমিস্ত্রির কাজ শুরু করেন। গত ১৪ আগস্ট রাতে তাঁদের মধ্যে দৈনিক পারিশ্রমিক ও অন্যান্য অর্থনৈতিক লেনদেন নিয়ে তীব্র বাগ্‌বিতণ্ডা সৃষ্টি হয়। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে তাদের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হলে আল-আমিন ক্ষিপ্ত হয়ে ধারালো ছুরি দিয়ে কামরুলের গলায় উপর্যুপরি আঘাত করেন। কামরুল মেঝেতে লুটিয়ে পড়লে মৃত্যু নিশ্চিত করতে তাঁর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করা হয়।
হত্যাকাণ্ড নিশ্চিত করার পর আল-আমিন ছুরিটি ঘরের বাথরুমে ফেলে দেন এবং নিহতের মোবাইল ফোন নিয়ে কক্ষটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে খুলনায় পালিয়ে যান। গ্রেপ্তার আল-আমিনকে আদালতে সোপর্দ করা হলে তিনি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় নিজের দোষ স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার এম এন মোর্শেদ বাড়িওয়ালা ও স্থানীয়দের অসচেতনতা প্রসঙ্গে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বাসা ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে ভাড়াটিয়াদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি, স্থায়ী ঠিকানা বা মোবাইল নম্বর সংরক্ষণ না করায় তদন্তের প্রাথমিক ধাপে জটিলতার সৃষ্টি হয়েছিল। অপরাধ প্রতিরোধ ও তদন্তে সহায়তার জন্য সব বাড়িওয়ালাকে ভাড়াটিয়াদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংরক্ষণের অনুরোধ জানান তিনি। মামলার আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
জাতীয় শীর্ষ সংবাদ