অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
ঋণপত্র বা লেটার অব ক্রেডিট (এলসি) খোলার পাশাপাশি এখন থেকে কোনো ধরনের মূল্যসীমা ছাড়াই সরাসরি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানির সুযোগ পাবেন দেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকরা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবসা সহজীকরণ, রপ্তানি সম্প্রসারণ এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করার লক্ষ্যে সরকার নতুন আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬-২০২৯ জারি করেছে।
সোমবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এই সংক্রান্ত নতুন আমদানি নীতির গেজেট প্রকাশ করে। এর আগে ২০২১-২০২৪ মেয়াদের আমদানি নীতির মেয়াদ ২০২৪ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার পর এতদিন আগের নীতির ধারাবাহিকতাই বজায় ছিল। নতুন এই আদেশে আমদানি অর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও নমনীয় করার পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বা ফ্রি ট্রেড জোন এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউস প্রতিষ্ঠার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্প খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে তাদের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগের ২০২১-২০২৪ সালের নীতিমালায় বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে এলসি ছাড়া নির্দিষ্ট আর্থিক সীমার মধ্যে পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও নতুন আদেশে সেই মূল্যসীমা সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রচলিত বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতি রেখে সেলস বা পারচেজ কনট্রাক্টের মাধ্যমে সরাসরি আমদানির পথ প্রশস্ত হয়েছে। এতে ব্যাংকিং চ্যানেলে এলসি খোলার বাধ্যবাধকতা কমে আসায় আমদানিকারক ও বিদেশি সরবরাহকারীর মধ্যকার বাণিজ্যিক লেনদেন আরও দ্রুত ও সহজ হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে এলসির বাইরে লেনদেন বাড়ার ফলে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং অর্থ পাচার রোধে কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তাও দেখা দিয়েছে।
নতুন আমদানি নীতির অন্যতম বড় একটি সংযোজন হলো মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রে ইঞ্জিনক্ষমতার সীমা বৃদ্ধি। পূর্বের নীতিমালায় সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন মোটরসাইকেল আমদানিতে কঠোর বিধিনিষেধ থাকলেও, নতুন আদেশে তা বাড়িয়ে ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত করা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ব্র্যান্ডের মাঝারি ও উচ্চক্ষমতার মোটরসাইকেল এখন থেকে সরাসরি দেশের বাজারে আমদানির সুযোগ তৈরি হয়েছে। এছাড়া রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের ধারাকে গতিশীল করতে রপ্তানিমুখী শিল্পে বিনা মূল্যে বা ফ্রি অব কস্ট ভিত্তিতে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির পরিধিও সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
আমদানি প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে পণ্যের এইচএস কোড ও বর্ণনার মধ্যকার অসামঞ্জস্য দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নীতিমালায় এইচএস কোডের সঠিক বর্ণনাকে চূড়ান্ত ভিত্তি হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা আমদানিকারকদের অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি এফটিএ, সেপা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির মতো বিষয়গুলোকে কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও সুসংহত করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, নতুন এই আমদানি নীতি বাস্তবায়িত হলে দেশের সামগ্রিক ব্যবসা ও লজিস্টিকস খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বৈদেশিক বাণিজ্যে গতিশীলতা আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।


