ইসরায়েল–ইরান সংঘাত: হামলা–পাল্টা হামলায় বিপর্যস্ত জনজীবন, আশ্রয়কেন্দ্রে সাধারণ মানুষ

ইসরায়েল–ইরান সংঘাত: হামলা–পাল্টা হামলায় বিপর্যস্ত জনজীবন, আশ্রয়কেন্দ্রে সাধারণ মানুষ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দুই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ইরানে একাধিক হামলার ঘটনায় মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হওয়ায় অনেকেই শহর ছেড়ে গ্রামীণ এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলে ইরানের পাল্টা হামলার কারণে তেল আবিব, জেরুজালেম ও হাইফাসহ বিভিন্ন শহরে সাধারণ মানুষকে নিরাপত্তার জন্য বাংকার, আন্ডারগ্রাউন্ড আশ্রয়কেন্দ্র এবং পাতাল স্থাপনায় অবস্থান নিতে দেখা যাচ্ছে।

সংঘাতের এই পরিস্থিতিতে ইসরায়েলের নগরজীবনে জরুরি অবকাঠামো ব্যবহারের একটি চিত্র সামনে এসেছে। একটি আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যম প্রকাশিত প্রামাণ্যচিত্রে তেল আবিবের একটি হাসপাতালের ভূগর্ভস্থ চিকিৎসা সুবিধা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, হাসপাতালটির ভূউপরিভাগে স্বাভাবিক চিকিৎসা অবকাঠামোর পাশাপাশি মাটির নিচে দুই তলা বিশিষ্ট একটি সুরক্ষিত চিকিৎসা ইউনিট রয়েছে। এই ইউনিটে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রায় ২৫০ জন রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

হাসপাতালটির চিকিৎসক অধ্যাপক ব্রিয়ান ফ্রেডম্যান জানান, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরুর পরপরই নিরাপত্তার কারণে প্রায় ২৫০ জন রোগীকে ভূগর্ভস্থ ওই ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। তিনি বলেন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখে দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের জরুরি অবকাঠামো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। হাসপাতালটির ভূগর্ভস্থ অংশকে সম্ভাব্য হামলা থেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ হিসেবে পরিকল্পনা করা হয়েছে। সেখানে সাধারণ রোগীদের পাশাপাশি সংঘাতে আহত ব্যক্তিদেরও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

ইসরায়েলের বিভিন্ন সংবাদসূত্রে জানা গেছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে দেশটির অনেক শহরে আবারও জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র ব্যবহারের প্রবণতা বেড়েছে। অতীতের একটি সামরিক সংঘাতের সময়ও ইসরায়েলের বাসিন্দাদের একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সাইরেন বাজলেই মানুষ দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্র বা বাংকারে চলে যাচ্ছেন।

প্রকাশিত ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, তেল আবিবের বিভিন্ন ভবনের নিচে অবস্থিত আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারগুলোতে সাধারণ মানুষ অবস্থান নিচ্ছেন। অনেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ কেউ সময় কাটাতে বই পড়ছেন, আবার কেউ অস্থায়ীভাবে বিছানা পেতে রাত কাটাচ্ছেন। আশ্রয় নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ইরানি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক খসরো নেমাতি বলেন, তিনি পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার আশা করছেন।

সংঘাত শুরুর দিন তেল আবিবে হামলার সাইরেন বাজতেই বহু মানুষ স্থানীয় সিনাগগ, আবাসিক ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড গ্যারেজ এবং পাতাল রেলস্টেশনে আশ্রয় নেন। তেল আবিবের অ্যালেনবি পাতাল রেলস্টেশনে আশ্রয় নেওয়া একজন বাসিন্দা জানান, তিনি যে ভবনে বসবাস করেন সেখানে নির্ধারিত আশ্রয়কেন্দ্র না থাকায় বাধ্য হয়ে রেলস্টেশনে অবস্থান নিতে হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার প্রকাশিত ভিডিওতেও তেল আবিবের বিভিন্ন স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চিহ্ন দেখা গেছে। কিছু ভবনের জানালার কাচ ভেঙে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায় এবং সেগুলো পরিষ্কার করার কাজ চলতে দেখা যায়। একই ভিডিওতে একটি পাতাল রেলস্টেশনে আশ্রয় নেওয়া মানুষের দৈনন্দিন অবস্থার চিত্রও উঠে আসে।

একজন বাসিন্দা আনা নেসতেরোভা বলেন, তার বসবাস করা ভবনের নিচে আশ্রয় নেওয়ার জায়গা থাকলেও একা থাকার কারণে তিনি সেখানে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করেন। তাই অন্যদের সঙ্গে থাকার জন্য তিনি পাতাল রেলস্টেশনে আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে তার সঙ্গে একটি পোষা কুকুরও রয়েছে। স্টেশনটিতে অনেককে বেঞ্চের ওপর ঘুমাতে দেখা গেছে।

অন্য এক বাসিন্দা লুসেট জানান, হামলার কারণে তিনি রাতভর ওই স্টেশনে অবস্থান করছেন। তার মতে, নিরাপত্তাজনিত কারণে আপাতত আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ছাড়া বিকল্প নেই।

তেল আবিবের আরেক বাসিন্দা সাকেজ জিভি বলেন, হামলায় তাদের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রায়ই সতর্কতামূলক সাইরেন বাজছে। তিনি এক সন্তানের জননী। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সাইরেন বাজলেই পরিবারের সদস্যরা দ্রুত আন্ডারগ্রাউন্ড শেল্টারে চলে যান। তিনি জানান, তার দেড় বছরের মেয়েও এখন সাইরেনের শব্দ শুনে বুঝতে পারে যে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সময় হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনা কেবল সামরিক অবকাঠামোতেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নগর অবকাঠামোর ওপরও প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে বড় শহরগুলোতে আশ্রয়কেন্দ্র, হাসপাতালের জরুরি ব্যবস্থা এবং জননিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নির্ভরশীলতা বেড়ে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ