আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইরান ঘোষণা দিয়েছে যে তাদের অনুমতি ছাড়া এ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করতে পারবে না। বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল এবং সমুদ্রপথে পরিবহন হওয়া তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে এবং ইউরোপে গ্যাসের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতির সূচনা ঘটে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযানের মাধ্যমে, যার লক্ষ্য ছিল ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা। সেই হামলার পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে ইরান আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও জ্বালানি পরিবহনের ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করে। সংঘাতের ১৬তম দিনে এসে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং আলোচনার সম্ভাবনাও নাকচ করেছেন। অপরদিকে ইরানও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো আলোচনায় বসবে না বলে জানিয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি তেহরানের শত্রুদের জন্য বন্ধ থাকবে। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই প্রণালিতে অন্তত ১৬টি জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে।
এ পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিত্র দেশগুলোর সহায়তা চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন যুক্তরাজ্যসহ কয়েকটি মিত্র দেশকে এ উদ্যোগে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানালেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সাড়া পাওয়া যায়নি। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে এবং বিভিন্ন বিকল্প পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
জাপান এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া না জানালেও স্থানীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। অন্যদিকে চীন যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে। ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র বলেছেন, স্থিতিশীল ও নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সব পক্ষের দায়িত্ব এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখবে বেইজিং।
ফ্রান্সও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সামরিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়নি। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, একটি বিমানবাহী রণতরী বর্তমানে পূর্ব ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করছে এবং তা অন্য কোথাও মোতায়েনের পরিকল্পনা নেই। দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধ সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করছে।
এদিকে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও কৌশলগত স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা অব্যাহত রয়েছে। রাজধানী তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে একাধিক বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হামলার শব্দ শোনা গেছে। শিরাজ শহরের আশপাশেও অল্প সময়ের মধ্যে একাধিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়। এছাড়া হরমুজগান প্রদেশেও বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, চলমান সামরিক অভিযানে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) বহু সদস্য হতাহত হয়েছেন। সংস্থাটির মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এফি ডিফ্রিন জানান, অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য আরও বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে। ইসরাইলি বাহিনী জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিম ও মধ্য ইরানে প্রায় ৪০০টি হামলা চালানো হয়েছে।
অন্যদিকে ইরানও ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে পাল্টা হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে। ইসরাইল জানিয়েছে, দেশটির মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলায় বিভিন্ন ধরনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ জানিয়েছে, তারা নিজেদের আকাশসীমায় প্রবেশ করা কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ধ্বংস করেছে। তবে ইরান এসব হামলার দায় অস্বীকার করে বলেছে, তাদের প্রযুক্তির অনুকরণে তৈরি ড্রোন ব্যবহার করে তৃতীয় পক্ষ হামলা চালিয়ে দায় তেহরানের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছে।
সংঘাতের কারণে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের দ্রুত বাণিজ্যিক ফ্লাইটে দেশটি ত্যাগ করার নির্দেশ দিয়েছে রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস। এর আগে ইরাকেও একই ধরনের সতর্কতা জারি করা হয়েছিল।
এদিকে সংঘাতের অবসানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। কয়েকটি দেশ মধ্যস্থতার চেষ্টা চালালেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়তে পারে।


