সারাদেশ ডেস্ক
খুলনা বিভাগে হঠাৎভাবে শিশুদের মধ্যে হাম আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও অন্যান্য জেলা হাসপাতালে গায়ে ব্যথা, জ্বর, সর্দি, কাশি ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি নিয়ে শিশু রোগীরা চিকিৎসা নিচ্ছেন। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় অন্তত ৭৯ জন শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে অন্তত ২৬ শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য সতর্ক সংকেত সৃষ্টি হয়েছে।
জেলার মধ্যে সর্বাধিক আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছে কুষ্টিয়ায়। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সদর হাসপাতাল মিলিয়ে বর্তমানে ৬৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছেন, যাদের অধিকাংশই হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি। এছাড়া যশোরে ৬ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪ জন এবং ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা ও মাগুরায় ২ জন করে শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যান্য জেলাতেও হাম ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই এক বছরের কম বয়সী শিশু। বিশেষ করে ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশুরা সংক্রমণের জন্য বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। যেসব শিশু এখনো পূর্ণ টিকাদান পাননি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তাদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি। হাম আক্রান্ত শিশুর মধ্যে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতাও তৈরি হচ্ছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি তিন শিশুর অবস্থা আশঙ্কাজনক, তাদের বয়স ৫ থেকে ৮ মাসের মধ্যে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কম থাকায় তাদের জটিলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা রুখশানা পারভীন বলেন, “হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা না থাকায় সাপোর্টিভ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সংক্রমণ প্রতিরোধে দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।”
স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের জন্য অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতি জটিল করছে। আইসোলেশন ইউনিট থাকলেও শয্যা ও প্রয়োজনীয় সুবিধা সীমিত। খুলনা সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে ও অন্যান্য হাসপাতালে পুরনো অবকাঠামোর কারণে চাপ সামলানো কঠিন হচ্ছে। এছাড়া জটিল রোগীদের জন্য এনআইসিইউ সুবিধা সীমিত থাকা বড় উদ্বেগের বিষয়।
খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মুজিবুর রহমান জানিয়েছেন, “সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা বিভাগের কিছু জেলায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে। জেলা হাসপাতালে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ড খোলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং অধিকাংশ হাসপাতালে কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসক, নার্সসহ চিকিৎসা সংক্রান্ত সব স্টাফকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “এনআইসিইউ সংকট এখনও চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্যান্য বড় জেলায় এনআইসিইউ সুবিধা বৃদ্ধি করার চেষ্টা চলছে, যাতে জটিল রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া যায়।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের বিস্তার রোধে নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা রুখশানা পারভীন আরও বলেন, “দ্রুত হামের ভ্যাক্সিনেশনের প্রোগ্রাম শুরু করতে হবে। শিশুদের মধ্যে জ্বর বা ফুসকুড়ির মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং আক্রান্তদের আলাদা রাখতে হবে।”
চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সকল অভিভাবককে সতর্ক করেছেন, সংক্রমণ রোধে শিশুরা যাতে পর্যাপ্ত ভ্যাক্সিন পায় এবং রোগীর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়।


