হাম সংক্রমণে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি, আইসিইউতে চাপ বাড়ছে

হাম সংক্রমণে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি, আইসিইউতে চাপ বাড়ছে

স্বাস্থ্য ডেস্ক

রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল (আইডিএইচ) গত তিন মাসে হাম সংক্রমণে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যু এবং হাসপাতালে অতিভর্তি রোগীর পরিস্থিতি নিয়ে সংকটপূর্ণ অবস্থা তৈরি হয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত হাসপাতালটিতে ২২টি শিশু মারা গেছে। তবে চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, মৃত্যুর নেপথ্যে শুধুমাত্র হাম নয়, বরং নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও জন্মগত হৃদরোগসহ অন্যান্য সহ-রোগ (কো-মরবিডিটি) গুরুতর ভূমিকা রেখেছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আইডিএইচ-এ ৮৬ জন হাম আক্রান্ত শিশু ভর্তি আছেন, যার মধ্যে ১২ জন আইসিইউতে। শয্যার বরাদ্দ মাত্র আটটি হলেও রোগীর সংখ্যা এর অনেক গুণ বেশি। এ কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে রাখা হচ্ছে। একই ওয়ার্ডে হাম, চিকেন পক্স ও নিউমোনিয়ার রোগীদের একত্রে রাখা হচ্ছে, যা নতুন সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে। জানুয়ারি মাসে ২৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছিল, ফেব্রুয়ারিতে সংখ্যা ৮৮ জনে পৌঁছায় এবং মার্চের ৩০ তারিখ পর্যন্ত ৪৫৫ জন ভর্তি হয়েছে।

হাসপাতালের জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) ডা. শ্রীবাস পাল বলেন, “মৃত শিশুদের অধিকাংশের বয়স ৩ থেকে ১০ মাসের মধ্যে। এই বয়সের শিশুরা এখনো টিকার আওতায় আসেনি, ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। মৃত শিশুদের প্রায় সবারই হামের সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া বা চোখের প্রদাহ ছিল। অনেকের আগে থেকে হৃদরোগ বা কিডনি জটিলতা ছিল। শুধুমাত্র হামের কারণে কোনো শিশুর মৃত্যু হয়নি।” তিনি আরও জানাচ্ছেন, হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং শরীরে র‍্যাশ দেখা দেওয়ার এক সপ্তাহ আগে থেকেই সংক্রমণ ছড়াতে শুরু করে।

হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ৮ নম্বর ওয়ার্ডে হাম, চিকেন পক্স ও নিউমোনিয়ার রোগীদের একত্রে রাখা হচ্ছে। এতে প্রত্যেক রোগীর জন্য সংক্রমণ ঝুঁকি বেড়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সরা জানাচ্ছেন, রোগীর সংখ্যার কারণে বাধ্য হয়ে তাদের একত্রে রাখা হচ্ছে। তবে অক্সিজেন সরবরাহ নিশ্চিত করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।

হামের প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি-কাশি, শরীর ব্যথা এবং চোখ লাল হওয়া দেখা দেয়। পরবর্তীতে মুখের ভেতরে ‘কপলিক স্পট’ এবং শরীরে লালচে দানা বা র‍্যাশ দেখা দিলে হাম শনাক্ত করা যায়।

জাতীয় টিকাদান-সংক্রান্ত কারিগরি উপদেষ্টা গ্রুপ (নাইট্যাগ) হাম সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী হারের পর জরুরি সভা করেছে। সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, নিয়মিত কর্মসূচির পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ছয় মাস বয়সী শিশুদের হামের টিকা প্রদান করা হবে।

হাসপাতালের উপচে পড়া রোগীর ভিড়ে দেখা গেছে, শয্যা না পেয়ে অসুস্থ শিশুরা মেঝেতে রাখা হচ্ছে। গাজীপুরের টঙ্গী থেকে ভর্তি পাঁচ মাস বয়সী শিশু মিনহাজের মা জানিয়েছেন, চার দিন ধরে তীব্র জ্বর এবং মুখে লাল দাগ দেখা দেয়ায় তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও নরসিংদী থেকে আসা শিশুরাও মেঝেতে চিকিৎসা পাচ্ছে।

চিকিৎসকরা সতর্ক করে জানাচ্ছেন, ভিন্ন ভিন্ন সংক্রামক রোগের রোগীদের একই স্থানে রাখা নতুন সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ায়। হাসপাতালের বর্তমান পরিস্থিতি নির্দেশ করছে, হাম সংক্রমণ ও সহ-রোগের সমন্বিত ঝুঁকি মোকাবেলায় জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ স্বাস্থ্য