অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
সরকার যখন বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ্রসাধন এবং বিলাসী খরচ কমাতে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, ঠিক তখনই একটি পন্টুন মেরামত প্রকল্পে সম্মানি, গাড়ি ভাড়া ও ভ্রমণ বিল বাবদ বিপুল অঙ্কের টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। সংস্থাটির প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পে এই প্রশাসনিক ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ৮৪ লাখ টাকা। সরকারের চলমান মিতব্যয়িতা নীতির পরিপন্থি হওয়ায় এই ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে গভীর সংশয় ও প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, জননিরাপত্তার স্বার্থে পন্টুন মেরামত অত্যন্ত জরুরি হলেও এর আড়ালে অন্তর্ভুক্ত কিছু প্রশাসনিক ব্যয় বর্তমান সরকারি নীতিমালার সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ‘দেশের বিভিন্ন নৌবন্দর ও লঞ্চ টার্মিনালের জরাজীর্ণ পন্টুন মেরামত ও প্রতিস্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট প্রস্তাবিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো দেশের নৌপথের নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা উন্নত করা। তবে এই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নিয়মিত সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য সম্মানি, গাড়ি ভাড়া এবং ভ্রমণ বিলের মতো বিতর্কিত খাতগুলো যুক্ত করায় তা কমিশনের তীব্র পর্যবেক্ষণের মুখে পড়েছে। প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী, প্রকল্প বাস্তবায়নকালীন সময়ে নিয়মিত তদারকি, দরপত্র মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সভায় অংশ নেওয়ার জন্য নিয়মিত সরকারি কর্মকর্তাদের সম্মানি বাবদ ১২ লাখ টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর বাইরে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত বেতন-ভাতা সচল থাকার পরও প্রকল্প বাস্তবায়ন ও তদারকির নামে গাড়ি ভাড়া ও ভ্রমণ বিল বাবদ আরও ৭২ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এই দুই খাতেই ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ৮৪ লাখ টাকা, যা একটি মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্পের জন্য অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্ট খাতের বিশেষজ্ঞরা এবং পরিকল্পনা কমিশনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, বিআইডব্লিউটিএর মতো একটি রাষ্ট্রায়ত্ত সেবাধর্মী ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ সাধারণত তাদের নিজস্ব আয় অথবা বার্ষিক পরিচালন বাজেট থেকেই সম্পন্ন হওয়ার কথা। জাতীয় রাজস্বের ওপর চাপ সৃষ্টি করে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে এ ধরনের রুটিন কাজ বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়াটিই মূলত অস্বাভাবিক। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে যেখানে অর্থ মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রায়ত্ত, স্বায়ত্তশাসিত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে সরকারি অর্থে যেকোনো ধরনের অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী ব্যয় পরিহার করার জন্য কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে, সেখানে এ ধরনের প্রস্তাবনা দায়িত্বশীলতার ঘাটতি নির্দেশ করে। বিশেষ করে গাড়ি ভাড়া, অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সফর এবং অতিরিক্ত সম্মানি প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের সুনির্দিষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। জাতীয় বাজেটের ওপর চাপ কমানো, আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা করার অংশ হিসেবেই রাষ্ট্র এই মিতব্যয়িতা নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছে।
পরিকল্পনা কমিশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, একটি প্রকৌশলভিত্তিক মেরামত প্রকল্পে পরিবহন সুবিধা ও সভার সম্মানির নামে ৮৪ লাখ টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রস্তাব সুশাসনের পরিপন্থি এবং এটি আর্থিক জবাবদিহিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। সরকার যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন কার্যকর করতে চাচ্ছে, সেখানে সরকারি কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার এই প্রবণতা নীতিগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
বিআইডব্লিউটিএর সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংস্থাটির অধীনে বর্তমানে সারা দেশে যাত্রী ও পণ্যবাহী নৌযানের যাতায়াত সুবিধার জন্য মোট ৬৫০টি পন্টুন নোঙর করা রয়েছে। দীর্ঘদিনের ব্যবহার এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এর মধ্যে অন্তত ১০৫টি পন্টুন বর্তমানে অত্যন্ত জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই ঝুঁকিপূর্ণ পন্টুনগুলো দ্রুত মেরামত বা প্রতিস্থাপন করার লক্ষ্যেই আলোচ্য প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনার আওতায় গাবতলী, সদরঘাট, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ, ভৈরব, ভূঞাপুর, অষ্টগ্রাম, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া, কাপ্তাই, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, হোমনা, বরিশাল, বাবুগঞ্জ, চরফ্যাশন, বেড়া ও কাজীপুরসহ দেশের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম লঞ্চ টার্মিনালগুলোর পন্টুন সংস্কার করার কথা রয়েছে।
বর্তমানে প্রকল্পটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত মূল্যায়ন ও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা স্পষ্ট করেছেন যে, জননিরাপত্তা ও নৌ-যোগাযোগের স্বার্থে পন্টুন সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই এবং প্রকল্পটির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের করের টাকার সর্বোচ্চ দক্ষ ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করা বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। তাই সরকারের ঘোষিত মিতব্যয়িতা নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রকল্পটির বিতর্কিত ও অপ্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যয়ের খাতগুলো অনুমোদনের পূর্বে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করা হবে। কোনো অবস্থাতেই মূল অবকাঠামো উন্নয়নের আড়ালে নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত সুবিধা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে না এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের আগে এই অবান্তর ব্যয় বাদ দেওয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।


