মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করল ইরানি পণ্যবাহী জাহাজ

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করল ইরানি পণ্যবাহী জাহাজ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করেই গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে ইরানের পতাকাবাহী একটি মালবাহী জাহাজ। ‘শুজা-২’ নামের এই জাহাজটি বর্তমানে ভারতের উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান রুট হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে ইরানের এ ধরনের পদক্ষেপ নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি করেছে।

জাহাজ চলাচলের তথ্য পর্যালোচনাকারী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ‘শুজা-২’ ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র শহীদ রাজায়ী বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে। বন্দর আব্বাসের নিকটবর্তী এই টার্মিনালটি ইরানের আমদানি-রপ্তানির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত। প্রাথমিক গন্তব্য হিসেবে ভারতের গুজরাট রাজ্যের কান্ডলা বন্দরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘মেরিন ট্রাফিক’-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি সফলভাবে হরমুজ প্রণালি পাড়ি দিয়ে বর্তমানে তার নির্ধারিত গন্তব্যের পথে রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা ও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় থেকে শুরু হওয়া ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতির আওতায় ইরানের তেল এবং শিপিং সেক্টরকে লক্ষ্য করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে বারবার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, ইরানের পতাকাবাহী জাহাজের সাথে কোনো দেশ বা সংস্থা লেনদেন করলে তাদেরও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের এই বাণিজ্যিক তৎপরতাকে ওয়াশিংটনের নীতির প্রতি তেহরানের সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়। এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ওপর যেকোনো ধরনের প্রভাব সরাসরি বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যে প্রভাব ফেলে। ইরান দীর্ঘকাল ধরেই দাবি করে আসছে যে, এই জলপথের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রধান দায়িত্ব তাদের। যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে অভিহিত করে তেহরান বারবারই তার বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ভারতের সাথে ইরানের দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্কের প্রেক্ষিতে এই জাহাজটির কান্ডলা বন্দরে পৌঁছানো দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

তবে এই ঘটনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সাধারণত নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের ঘটনায় মার্কিন প্রশাসন তদন্ত সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট জাহাজ বা কোম্পানির বিরুদ্ধে নতুন করে ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে। ‘শুজা-২’ জাহাজটির ভারতযাত্রা এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। অনেক দেশ যেখানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে ইরানের সাথে সরাসরি লেনদেন থেকে বিরত থাকছে, সেখানে ভারতের বন্দরে জাহাজটির নোঙর করার বিষয়টি ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের ঘটনা আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। একদিকে ইরান নিজের অর্থনৈতিক সক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করছে, অন্যদিকে পশ্চিমা দেশগুলো তাদের আরোপিত অবরোধের কার্যকারিতা বজায় রাখতে সচেষ্ট। সমুদ্রপথে এই স্নায়ুযুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে জাহাজটির গতিপথ এবং পরবর্তী অবস্থান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ