আইন আদালত ডেস্ক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিরা মাহজাবিন মিমোকে (২৬) আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে করা মামলায় একই বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দিয়েছেন আদালত। আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এই নির্দেশনা প্রদান করেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, সোমবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাড্ডা থানার এসআই কাজী ইকবাল হোসেন আসামি সুদীপ চক্রবর্তীকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করেন। মামলার তদন্ত কার্যক্রম চলমান থাকায় তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিকে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন তিনি। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রিপন হোসেন আবেদন মঞ্জুর করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে গতকাল রোববার (২৬ এপ্রিল) রাজধানীর উত্তর বাড্ডা এলাকা থেকে পুলিশ সুদীপ চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করে।
ঘটনার বিবরণীতে জানা যায়, গত রোববার সকালে রাজধানীর বাড্ডা থানা এলাকার উদয় ম্যানসন রোডের বাসায় মুনিরা মাহজাবিন মিমোকে তাঁর বাবা সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁকে নিচে নামিয়ে আনলে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
একই দিন মিমোর বাবা গোলাম মোস্তফা (৬২) বাড্ডা থানায় সহযোগী অধ্যাপক সুদীপ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে মেয়েকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়, মিমোর ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা ও কল হিস্ট্রি পর্যবেক্ষণ করে সুদীপ চক্রবর্তীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি সামনে আসে। গত ২৭ এপ্রিল রাত ১টার দিকে আসামি ও ভুক্তভোগীর মধ্যে দীর্ঘ সময় ভিডিও কলে কথোপকথন হয়েছিল। বাদীর অভিযোগ, সেই কথোপকথনের প্রেক্ষিতে আসামি সুদীপ চক্রবর্তীর দ্বারা প্ররোচিত হয়ে তাঁর মেয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাবশালী শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীর এমন গুরুতর অভিযোগ ও গ্রেফতারের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত সুদীপ চক্রবর্তী একজন খ্যাতিমান নাট্য নির্দেশক এবং দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগে শিক্ষকতা করছেন। অন্যদিকে, মুনিরা মাহজাবিন মিমো বিভাগের অত্যন্ত মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
আইনজীবীরা জানিয়েছেন, আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলাটি বর্তমানে অত্যন্ত স্পর্শকাতর পর্যায়ে রয়েছে। হোয়াটসঅ্যাপের সেই ভিডিও কলে ঠিক কী ধরনের কথোপকথন হয়েছিল এবং এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদী কোনো মানসিক নির্যাতনের ইতিহাস আছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানিয়েছেন, ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মোবাইল ফোনের তথ্য পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
সাধারণত বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি কাউকে আত্মহত্যা করতে প্ররোচনা দেয়, তবে অপরাধ প্রমাণিত হলে তার ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। এই মামলার ক্ষেত্রেও আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিচার করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি না দিলেও ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে, মিমোর অকাল মৃত্যুতে তাঁর পরিবার ও সহপাঠীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, মামলার তদন্ত শেষে দ্রুতই আদালতে চার্জশিট বা প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। বর্তমানে মামলার পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য আইনি প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।


