ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন শিল্প নীতিতে চীনের গভীর উদ্বেগ ও পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন শিল্প নীতিতে চীনের গভীর উদ্বেগ ও পাল্টা ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রস্তাবিত নতুন শিল্প নীতি ‘মেইড ইন ইউরোপ’ নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে চীন। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই নীতি বাস্তবায়ন করা হলে তারা পাল্টা পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। মূলত ইউরোপীয় বাজারে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা এবং স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে ইইউ যে বিধিনিষেধ আরোপের পরিকল্পনা করছে, তাকে ‘ব্যবস্থাগত বৈষম্য’ হিসেবে অভিহিত করেছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি।

গত মার্চ মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যাকসেলারেটর অ্যাক্ট’ নামক এই নতুন বিধিমালা উন্মোচন করে। এই প্রস্তাবের মূল লক্ষ্য হলো গাড়ি উৎপাদন, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি এবং ইস্পাতের মতো কৌশলগত খাতে ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা। নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়েছে, যেসকল সংস্থা সরকারি তহবিল বা প্রণোদনা পেতে আগ্রহী, তাদের উৎপাদিত পণ্যে ইউরোপে তৈরি যন্ত্রাংশের একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম সীমা বজায় রাখতে হবে। এই শর্তটি বিদেশি বিশেষ করে চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সোমবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানায়, তারা গত শুক্রবার ইউরোপীয় কমিশনের কাছে এই প্রস্তাবের বিপরীতে তাদের সুনির্দিষ্ট মতামত ও গভীর উদ্বেগ জমা দিয়েছে। বেইজিংয়ের দাবি, এই আইনটি বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্য নীতির পরিপন্থী এবং এটি আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনকে বাধাগ্রস্ত করবে। বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, “ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি এই আইনটি কার্যকর করার পথে এগিয়ে যায় এবং এর ফলে চীনা কোম্পানিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়, তবে চীন তার বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করে আসছিলেন যে, চীনের রাষ্ট্রীয় ভর্তুকিপ্রাপ্ত কোম্পানিগুলোর কারণে তারা বাজারে অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছেন। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের দ্রুত বিস্তার ইউরোপের স্থানীয় শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলেছে। ইউরোপীয় নীতিনির্ধারকদের মতে, এই নতুন আইনের উদ্দেশ্য হলো ইউরোপের শিল্পখাতকে শক্তিশালী করা, প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো এবং সম্ভাব্য ব্যাপক কর্মসংস্থান সংকট মোকাবিলা করা।

প্রস্তাবিত নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, বিদেশি কোম্পানিগুলোকে ইউরোপে বড় পরিসরে ব্যবসা পরিচালনা করতে হলে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব তৈরি করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি বিনিময় করতে হবে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই শর্তটি মূলত চীনের ব্যাটারি শিল্প এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের লক্ষ্য করেই তৈরি করা হয়েছে। ইউরোপ চাইছে তাদের বাজারে প্রবেশের বিনিময়ে উন্নত প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করতে, যা চীন সহজভাবে নিচ্ছে না।

চলতি মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নে অবস্থিত চীনা চেম্বার অব কমার্স এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইইউর এই পরিকল্পনা স্পষ্টভাবে সুরক্ষাবাদী নীতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এটি কেবল চীনা বিনিয়োগকেই নিরুৎসাহিত করবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে ইইউ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সহযোগিতাকেও খাদের কিনারে ঠেলে দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ সৃষ্টি করতে পারে। যদি চীন সত্যিই পাল্টা শুল্ক বা রফতানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে, তবে তার প্রভাব পড়বে বিশ্ববাজারে কাঁচামাল সরবরাহ এবং পণ্যের মূল্যের ওপর। বর্তমানে ইউরোপ ও চীনের মধ্যকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক এক জটিল মোড় পার করছে, যেখানে একদিকে রয়েছে অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের লড়াই। ইইউ এই আইনের চূড়ান্ত রূপরেখা কীভাবে নির্ধারণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনে এশিয়ার এই পরাশক্তির সঙ্গে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্কের গতিপথ।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ