প্রযুক্তি ও করপোরেট ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের দুই প্রভাবশালী পক্ষ—টেসলা প্রধান ইলন মাস্ক এবং চ্যাটজিপিটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর মধ্যকার দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই এক চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি আদালতে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। জুরি নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই আইনি প্রক্রিয়াটি কেবল ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব নয়, বরং এআই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ ও নৈতিকতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
আদালতের নথি ও মামলার বিবরণ অনুযায়ী, এই লড়াইয়ের মূলে রয়েছে ওপেনএআই-এর আদর্শিক বিবর্তন। ২০১৫ সালে যখন ওপেনএআই প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন এর লক্ষ্য ছিল একটি অলাভজনক গবেষণাগার হিসেবে মানবজাতির কল্যাণে কাজ করা। ইলন মাস্কের অভিযোগ, সিইও স্যাম অল্টম্যান তাকে প্রলুব্ধ করে এই প্রকল্পে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করিয়েছিলেন এই প্রতিশ্রুতিতে যে, প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তি হবে উন্মুক্ত এবং সবার জন্য উন্মুক্ত। তবে মাস্কের দাবি, বর্তমানে ওপেনএআই তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটের একটি অনুগত ও মুনাফাভোগী শাখায় পরিণত হয়েছে।
সান ফ্রান্সিসকোর ওকল্যান্ডের একটি আদালতে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলার রায় এআই শিল্পের বাণিজ্যিকীকরণের সীমানা নির্ধারণ করে দিতে পারে। বিশেষ করে, একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে যাত্রা শুরু করে কীভাবে বিশাল অঙ্কের মুনাফা অর্জনকারী সংস্থায় রূপান্তরিত হওয়া যায়, সেই আইনি বৈধতা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
মামলার নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার ও অবকাঠামো নির্মাণে শত শত বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন পড়ে। এই বিপুল ব্যয়ের জোগান দিতেই ওপেনএআই একটি বাণিজ্যিক শাখা গঠন করে, যেখানে মাইক্রোসফট বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ নিশ্চিত করে। এই বিনিয়োগের ফলে মাইক্রোসফটের প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেল্লাও এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিপক্ষ ইলন মাস্কের আইনি অবস্থান অত্যন্ত কঠোর। তিনি মনে করেন, ওপেনএআই-এর বর্তমান কাঠামো তাকে ও এর প্রাথমিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা। মাস্কের পক্ষ থেকে দাবি জানানো হয়েছে, ওপেনএআই-কে পুনরায় সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি বর্তমান সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং সহ-প্রতিষ্ঠাতা গ্রেগ ব্রকম্যানকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি তুলেছেন। উল্লেখযোগ্য যে, মাস্ক প্রথমে ১৩৪ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও পরবর্তীতে সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আদালত থেকে প্রাপ্ত কোনো অর্থ পুরস্কার তিনি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করবেন না, বরং তা ওপেনএআই-এর অলাভজনক সেকশনে দান করা হবে।
অন্যদিকে, ওপেনএআই কর্তৃপক্ষ এই মামলাকে সরাসরি ‘হয়রানিমূলক প্রচারণা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। আদালতের কাছে জমা দেওয়া নথিতে তারা দাবি করেছে, ইলন মাস্ক মূলত প্রতিষ্ঠানটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে চেয়েছিলেন এবং তা ব্যর্থ হওয়ার পর থেকেই তিনি এই বৈরী আচরণ শুরু করেছেন। ওপেনএআই-এর মতে, মাস্কের এই মামলা মূলত ঈর্ষা ও ব্যবসায়িক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত, কারণ মাস্কের নিজস্ব এআই ল্যাব ‘এক্সএআই’ বর্তমানে চ্যাটজিপিটির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় লড়ছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, মাস্ক নিজেই এআই খাতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ভয়ে এই প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছেন।
বিচারের এই পর্যায়ে জুরি বোর্ডের মতামতের ওপর ভিত্তি করে মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে বিচারক তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাতে পারেন। ওপেনএআই কি সত্যিই তার প্রাথমিক চুক্তিনামা বা বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে, নাকি এটি কেবল প্রযুক্তির বিবর্তনের একটি স্বাভাবিক অংশ—তা নির্ধারণ করবে এই আদালত।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি এবং দ্রুততম ক্রমবর্ধমান স্টার্টআপের এই সংঘাত কেবল আইনি সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এআই প্রযুক্তির মালিকানা, স্বচ্ছতা এবং বৈশ্বিক কল্যাণে এর ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ওপেনএআই যদি এই লড়াইয়ে পরাজিত হয়, তবে তা সিলিকন ভ্যালির অন্যান্য এআই স্টার্টআপগুলোর জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়াবে। আর যদি মাস্কের দাবি প্রত্যাখ্যাত হয়, তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বাণিজ্যিকীকরণের পথ আরও সুগম হবে। আগামী কয়েক সপ্তাহ পুরো প্রযুক্তি বিশ্ব ও আইন বিশেষজ্ঞরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন এই বিচারিক কার্যক্রমের প্রতিটি মোড়।


