ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় পিএবিএস চুক্তি: জেনেভায় চূড়ান্ত পর্বের আলোচনায় মুখোমুখি ধনী ও গরিব দেশগুলো

ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় পিএবিএস চুক্তি: জেনেভায় চূড়ান্ত পর্বের আলোচনায় মুখোমুখি ধনী ও গরিব দেশগুলো

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভবিষ্যৎ মহামারি মোকাবিলায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ঐতিহাসিক মহামারি চুক্তির একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অমীমাংসিত অংশ চূড়ান্ত করতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় সোমবার থেকে শুরু হয়েছে বিশেষ আলোচনা। এক সপ্তাহের এই নিবিড় আলোচনার মূল লক্ষ্য হলো ‘প্যাথোজেন অ্যাক্সেস অ্যান্ড বেনিফিট-শেয়ারিং’ (পিএবিএস) ব্যবস্থার রূপরেখা চূড়ান্ত করা। তবে এই প্রক্রিয়ায় টিকা ও চিকিৎসাসামগ্রীর ন্যায্য বণ্টন এবং তথ্য বিনিময় নিয়ে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনাস্থা ও স্বার্থের সংঘাত আলোচনার টেবিলে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০২১ সালে শুরু হওয়া দীর্ঘ তিন বছরের আলোচনার পর ২০২৫ সালের মে মাসে কোভিড-১৯ মহামারির অভিজ্ঞতাকে পাথেয় করে ডব্লিউএইচও সদস্য দেশগুলো একটি বৈশ্বিক মহামারি চুক্তি গ্রহণ করে। তবে সেই সময় দ্রুত ঐকমত্যে পৌঁছানোর তাগিদে চুক্তির সবচেয়ে বিতর্কিত অংশ অর্থাৎ পিএবিএস পদ্ধতিটিকে আলাদা রাখা হয়েছিল। বর্তমান আলোচনাটি সেই বকেয়া কাজ শেষ করার শেষ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আগামী ১৮ মে থেকে শুরু হতে যাওয়া ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে এই প্রস্তাবিত ব্যবস্থাটি অনুমোদনের জন্য পেশ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পিএবিএস ব্যবস্থার মূল কাঠামোটি আবর্তিত হচ্ছে মহামারি সৃষ্টিকারী জীবাণু বা প্যাথোজেনের নমুনা এবং তা থেকে তৈরি টিকা ও চিকিৎসার সমবণ্টন নিয়ে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রধান উদ্বেগ হলো, সংকটের সময় তারা তাদের দেশে আবিষ্কৃত ভাইরাসের নমুনা বা জেনেটিক তথ্য বিশ্ববাসীর স্বার্থে ভাগ করে নেয়, কিন্তু বিনিময়ে উন্নত বিশ্ব থেকে জীবনরক্ষাকারী টিকার ন্যায্য হিস্যা পায় না। অন্যদিকে, উন্নত বিশ্বের দেশগুলো ও তাদের ওষুধ শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর যুক্তি হলো, মুনাফা বা বিনিয়োগের সঠিক প্রত্যাবর্তনের নিশ্চয়তা ছাড়া উদ্ভাবনী সংস্থাগুলো এই বৈশ্বিক চুক্তিতে অংশ নিতে উৎসাহ হারাবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান বিজ্ঞানী সিলভি ব্রিয়ান্ড আলোচনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জানান, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে প্রবল অনাস্থা কাজ করছে। তারা মনে করে, টিকার প্রাপ্তি নিশ্চিত না করে ভাইরাস ভাগ করে নেওয়া তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পাশাপাশি আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো জেনেটিক তথ্যের বিনিময়। বর্তমান প্রযুক্তিতে কোনো ভৌত ভাইরাসের নমুনার চেয়ে তার জেনেটিক তথ্য বা ডিজিটাল সিকোয়েন্সিং অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই দ্রুততম সময়ে টিকা ও পরীক্ষার সরঞ্জাম তৈরি সম্ভব হয়, যা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে এখনও ঐকমত্য তৈরি হয়নি।

আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই চুক্তিটি টিকে থাকার লড়াই হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকার মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো উন্নত দেশগুলো থেকে উন্নত প্রযুক্তির হস্তান্তর বা ‘টেকনোলজি ট্রান্সফার’ দাবি করছে। অন্যদিকে, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলো মূলত জরুরি সময়ে স্বাস্থ্যসেবা পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের ওপর জোর দিচ্ছে। পাকিস্তান মিশনের কূটনৈতিক প্রতিনিধি আদিল মুমতাজ খোখার আলোচনার জটিলতা স্বীকার করে বলেন, লাইসেন্সিং ও প্রযুক্তি হস্তান্তর নিয়ে বড় ধরনের বিতর্ক রয়ে গেছে, তবে একটি টেকসই সমাধানের বিষয়ে তারা আশাবাদী।

আলোচনায় কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে। জেনেভায় নিযুক্ত ব্রাজিলীয় কূটনীতিক জাঁ কারিদাকিস জানিয়েছেন, দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এখনও পাহাড়সম হলেও সমঝোতা একেবারেই অসম্ভব নয়। তবে অগ্রগতি ধীর এবং আগামী শুক্রবারের মধ্যে একটি চূড়ান্ত খসড়ায় পৌঁছাতে হলে সব পক্ষকেই বড় ধরনের আপস করতে হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্ব যে বৈষম্য প্রত্যক্ষ করেছিল, তা থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ হলো একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো বা পিএবিএস চুক্তি। যদি এই এক সপ্তাহের আলোচনায় দেশগুলো কোনো একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ব্যর্থ হয়, তবে ভবিষ্যৎ কোনো জনস্বাস্থ্য সংকটে উন্নয়নশীল বিশ্বের দেশগুলো আবারো অরক্ষিত হয়ে পড়ার এবং বৈশ্বিক সহযোগিতা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। বিশ্বের নজর এখন জেনেভার এইুদ্ধক্ষেত্রের দিকে, যেখানে নির্ধারিত হবে আগামী দশকের বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ গতিপথ।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ