ট্রাম্প-পুতিন ফোনালাপ: ইরান যুদ্ধবিরতির প্রশংসা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে রাশিয়ার সতর্কবার্তা

ট্রাম্প-পুতিন ফোনালাপ: ইরান যুদ্ধবিরতির প্রশংসা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে রাশিয়ার সতর্কবার্তা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের মধ্যে এক দীর্ঘ ফোনালাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল বুধবার অনুষ্ঠিত ৯০ মিনিটেরও বেশি সময় স্থায়ী এই আলোচনায় ইরান ও ইউক্রেন পরিস্থিতি বিশেষ গুরুত্ব পায়। আলাপে ইরানে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানানোর পাশাপাশি যেকোনো ধরনের সামরিক সংঘাতের বিধ্বংসী পরিণতি নিয়ে ওয়াশিংটনকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন পুতিন।

প্রেসিডেন্ট পুতিনের দাপ্তরিক বাসভবন ক্রেমলিনের মুখপাত্র ইউরি উশাকভ মস্কোতে এক সংবাদ সম্মেলনে এই ফোনালাপের বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত করেছেন। উশাকভ জানান, দুই নেতার মধ্যকার আলোচনা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং সুনির্দিষ্ট বিষয়বস্তু কেন্দ্রিক। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিরসনে বর্তমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ গুরুত্বারোপ করেছে।

সংবাদ সম্মেলনে ইউরি উশাকভ বলেন, ইরানে যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানোর যে পদক্ষেপ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রহণ করেছেন, তাকে সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন ভ্লাদিমির পুতিন। রুশ প্রেসিডেন্টের মতে, এই পদক্ষেপ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আলোচনার একটি নতুন পথ উন্মোচন করবে এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা কমিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। রাশিয়া শুরু থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং মার্কিন প্রশাসনের এই নমনীয় মনোভাবকে তারা ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।

তবে আলোচনার এক পর্যায়ে পুতিন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি কোনো কারণে এই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘিত হয় বা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পুনরায় ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে, তবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ। তিনি উল্লেখ করেন, ইরান ও তার প্রতিবেশী দেশগুলো ছাড়িয়ে এই সংঘাতের বিধ্বংসী প্রভাব সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর পড়বে। এই ধরনের পরিস্থিতি বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য এক বড় বিপর্যয় বয়ে আনতে পারে বলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে সতর্ক করেন তিনি।

রুশ প্রেসিডেন্ট জোর দিয়ে বলেন, ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান রাজনৈতিক ও কৌশলগত মতপার্থক্যগুলো নিরসনে কূটনৈতিক পন্থাই হচ্ছে একমাত্র কার্যকর সমাধান। সামরিক শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে টেবিলের আলোচনায় বসে সংকট সমাধানের পরামর্শ দেন তিনি। একই সাথে পুতিন আশ্বাস দিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি শান্তিপূর্ণ উপায়ে ইরানের সাথে দীর্ঘমেয়াদী সমঝোতায় আসতে চায়, তবে রাশিয়া প্রয়োজনীয় সব ধরনের কূটনৈতিক ও মধ্যস্থতাকারী সহায়তা প্রদান করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ইরান ইস্যুর পাশাপাশি বিশ্ব রাজনীতির আরেক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়েও দুই নেতার মধ্যে বিস্তারিত কথা হয়েছে। ক্রেমলিন জানায়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেন পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন। এর জবাবে পুতিন বর্তমান রণকৌশল সম্পর্কে তাকে অবহিত করেন।

পুতিন জানান, রুশ বাহিনী বর্তমানে ইউক্রেনে নতুন কোনো ভূখণ্ড দখলের চেয়ে বরং ইতোমধ্যে তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। এসব এলাকা থেকে ইউক্রেনীয় বাহিনীর উপস্থিতি পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে নিজেদের অবস্থান সংহত করাই এখন রাশিয়ার মূল লক্ষ্য। পুতিনের এই বক্তব্য থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, মস্কো বর্তমানে সম্মুখ সমরে বড় ধরনের প্রসারের চেয়ে নিজেদের অধিকৃত সীমানা সুরক্ষায় মনোযোগী হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প ও পুতিনের এই দীর্ঘ ফোনালাপ বৈশ্বিক রাজনীতির সমীকরণে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকেই রাশিয়ার সাথে একটি কাজের সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা করছেন, যার প্রতিফলন এই দীর্ঘ সংলাপে দেখা গেছে। তবে ইরানের ক্ষেত্রে রাশিয়ার এই সতর্কবার্তা স্পষ্ট করে দেয় যে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কোনো বড় যুদ্ধের ব্যাপারে ক্রেমলিন অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

একদিকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ, অন্যদিকে রাশিয়ার কূটনৈতিক মধ্যস্থতার প্রস্তাব— এই দুইয়ের মাঝে আগামী দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এই ফোনালাপ অন্তত এতটুকু নিশ্চিত করেছে যে, শীর্ষ পর্যায়ের আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বনেতারা বড় ধরনের কোনো সামরিক সংঘাত এড়ানোর পথ খুঁজছেন। এই আলোচনা বিশ্ব অর্থনীতি ও তেলের বাজারের অস্থিরতা কমাতেও পরোক্ষভাবে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ