ডিজিটাল ব্যাংকিং জালিয়াতি প্রতিরোধে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব

ডিজিটাল ব্যাংকিং জালিয়াতি প্রতিরোধে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভারতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অনলাইন আর্থিক জালিয়াতি। বিশেষ করে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে সাধারণ গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা এখন চরম পর্যায়ে। এমন প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা জোরদারে বেশ কিছু বৈপ্লবিক ও কঠোর পদক্ষেপের প্রস্তাব করেছে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক—রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই)।

ঘটনার প্রেক্ষাপট ও জালিয়াতির নতুন কৌশল সম্প্রতি পুনে শহরের এক আইটি বিশ্লেষক ডিজিটাল প্রতারণার শিকার হয়ে কয়েক মিনিটের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ড থেকে প্রায় সোয়া তিন হাজার মার্কিন ডলার হারান। ট্রাফিক জরিমানা প্রদানের ভুয়া বার্তা এবং একটি লিঙ্কে ক্লিক করার মাধ্যমে এই জালিয়াতি সম্পন্ন হয়। বিশেষজ্ঞরা একে ‘সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ বলছেন, যেখানে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা জরুরি প্রয়োজন দেখিয়ে গ্রাহককে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২৫ সাল নাগাদ দেশটিতে ডিজিটাল জালিয়াতির হার প্রায় ৪ হাজার ৩০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই সময়ে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ সম্মিলিতভাবে ২৫০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ খুইয়েছেন।

আরবিআই-এর প্রস্তাবিত সুরক্ষা ব্যবস্থা আর্থিক ক্ষতি কমাতে আরবিআই একটি বিশদ আলোচনাপত্র প্রকাশ করেছে। এতে প্রধানত চারটি বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে:

১. লেনদেনে বিলম্ব (টাইম ল্যাগ): এক অ্যাকাউন্ট থেকে অন্য অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে কমপক্ষে এক ঘণ্টার বিরতি রাখা। এতে কোনো গ্রাহক প্রতারিত হয়েছে বুঝতে পারলে ওই সময়ের মধ্যে লেনদেন বাতিল করার সুযোগ পাবেন। ২. অতিরিক্ত যাচাইকরণ: প্রবীণ বা বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহকদের ক্ষেত্রে বড় অংকের লেনদেনে পরিবারের কোনো সদস্য বা একজন ‘বিশ্বস্ত ব্যক্তি’র ডিজিটাল অনুমোদনের বিধান রাখা। ৩. মিউল অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণ: হঠাৎ বড় অংকের অর্থ জমা হওয়া বা সন্দেহজনক অ্যাকাউন্টগুলোর লেনদেনে সীমা নির্ধারণ এবং নিয়মিত পর্যালোচনা করা। যাতে এই অ্যাকাউন্টগুলো অবৈধ অর্থ স্থানান্তরের বাহন বা ‘মিউল’ হিসেবে ব্যবহৃত হতে না পারে। ৪. ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ: কার্ড বা ডিজিটাল পেমেন্ট সুইচ অন-অফ করা এবং লেনদেনের সীমা নির্ধারণে গ্রাহককে সরাসরি অ্যাপের মাধ্যমে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া।

বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ ও বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা আরবিআই-এর এই প্রস্তাবগুলো নিয়ে ব্যাংকিং ও প্রযুক্তি মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এক ঘণ্টার বিলম্ব পদ্ধতি ওটিপি (OTP) জালিয়াতি রোধে কিছুটা কার্যকর হলেও এটি ডিজিটাল পেমেন্টের মূল বৈশিষ্ট্য ‘দ্রুততা’র সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক কর্মকর্তারা এই পদক্ষেপকে ‘এক্সপ্রেসওয়েতে স্পিডব্রেকার’ বসানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন।

প্রযুক্তি সংস্থা ‘আইডিফাই’-এর মতে, বর্তমানের জটিল ও তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থায় লেনদেন আটকে রাখা বা বাতিল করার প্রক্রিয়াটি বাস্তবায়ন করা কারিগরি ও ব্যয়বহুল একটি কাজ। এছাড়া প্রতারকরা দ্রুতই তাদের কৌশল পরিবর্তন করে এই সময়ের সীমাবদ্ধতাকে পাশ কাটানোর পথ খুঁজে নিতে পারে। প্রবীণদের লেনদেনে তৃতীয় পক্ষের অনুমোদনের বিষয়টিও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও আইনি দায়বদ্ধতার প্রশ্নে জটিলতা তৈরি করতে পারে।

প্রযুক্তিগত সমাধান ও সমন্বয় আরবিআই ইনোভেশন হাবের সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, শুধু আইন করে জালিয়াতি রোধ সম্ভব নয়। এর পরিবর্তে ‘মিউলহান্টার ডট এআই’ (MuleHunter.ai)-এর মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহজনক অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করা জরুরি। এছাড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আর্থিক খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে পুলিশ প্রশাসন, প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।

ভারতের এই প্রস্তাবিত নীতিমালাগুলো শেষ পর্যন্ত কার্যকর হলে তা বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল পেমেন্ট নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করবে সাধারণ গ্রাহকের সচেতনতা এবং ব্যাংকগুলোর প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর।

আন্তর্জাতিক