আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান যুদ্ধ ও ভূ-রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎসের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধের জেরে জার্মানি থেকে প্রায় ৫ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে ট্রান্স-আটলান্টিক নিরাপত্তা বলয় ও সামরিক জোট ন্যাটোর স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। জার্মানি এই সিদ্ধান্তকে প্রত্যাশিত বললেও ন্যাটো মিত্ররা বিস্তারিত তথ্যের জন্য ওয়াশিংটনের দিকে তাকিয়ে আছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিক মের্ৎস মন্তব্য করেছিলেন যে, ইরান সংঘাত নিরসনে আলোচনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অপদস্থ’ হতে হয়েছে এবং ওয়াশিংটনের কোনো সুস্পষ্ট কৌশল নেই। এই বক্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি চ্যান্সেলরের সমালোচনা করেন এবং এর পরপরই জার্মানি থেকে সেনা সরানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা আসে। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পারনেল জানিয়েছেন, মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথের নির্দেশনায় আগামী ছয় থেকে ১২ মাসের মধ্যে এই প্রত্যাহার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে পারে।
জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস মার্কিন এই সিদ্ধান্তকে ‘অনুমিত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, ইউরোপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ করে জার্মানিতে মার্কিন সেনাদের উপস্থিতি উভয় দেশের স্বার্থেই সমান গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান বাস্তবতায় ইউরোপকে এখন থেকে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরও বেশি করে নিজেদের কাঁধেই তুলে নিতে হবে বলে তিনি সতর্ক করেন।
এদিকে, ন্যাটোর মুখপাত্র অ্যালিসন হার্ট জানিয়েছেন, জোটের পক্ষ থেকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তিনি এক বার্তায় উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবস্থান স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে ইউরোপীয় দেশগুলোকে তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটে বরাদ্দ আরও বৃদ্ধি করতে হবে। গত বছর দ্য হেগ সম্মেলনে জোটভুক্ত দেশগুলোর জিডিপির ৫ শতাংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেই পথে অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনীয়তা এখন আরও বেড়েছে।
বর্তমানে জার্মানিতে প্রায় ৩৬ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যা ইউরোপ মহাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সামরিক উপস্থিতি। এর বাইরে ইতালিতে ১২ হাজার এবং যুক্তরাজ্যে ১০ হাজার সেনা অবস্থান করছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, প্রত্যাহারের সংখ্যা কেবল ৫ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। গত বছর রোমানিয়া থেকেও সেনা কমিয়ে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে মনোযোগ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছিল পেন্টাগন। তবে ন্যাটোর ৩২টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে এই ধারাবাহিক সেনা হ্রাসের প্রবণতা নিয়ে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক এই পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ন্যাটোর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বাইরের কোনো শক্তি নয়, বরং নিজেদের অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ভাঙন। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রিপাবলিকান দলের জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা সিনেটর রজার উইকার ও প্রতিনিধি মাইক রজার্স ইউরোপে শক্তিশালী উপস্থিতি বজায় রাখা মার্কিন জাতীয় স্বার্থের জন্য জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন।
জার্মানি দীর্ঘকাল ধরে তাদের জিডিপির একটি ছোট অংশ প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করার কারণে ট্রাম্পের সমালোচনার মুখে ছিল। তবে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বার্লিন তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেছে। ২০২৭ সাল নাগাদ জার্মানির মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩.১ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার মধ্যে ইউক্রেনকে সহায়তার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও ইরানের বন্দরে নৌ-অবরোধকে কেন্দ্র করে মিত্রদের সক্রিয় ভূমিকার অভাবই ট্রাম্পকে এই কঠোর সিদ্ধান্তে প্ররোচিত করেছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো সচল রাখতে জার্মানি ও অন্যান্য ন্যাটো মিত্রদের নির্লিপ্ততা ওয়াশিংটনকে ক্ষুব্ধ করেছে। এই সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কেবল জার্মানি নয়, বরং সামগ্রিকভাবে ইউরোপের নিরাপত্তা মানচিত্র এবং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ কার্যকারিতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


