সিলেটে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮: শোকাচ্ছন্ন পরিবার, সংকটে চার শিশু

সিলেটে ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮: শোকাচ্ছন্ন পরিবার, সংকটে চার শিশু

অপরাধ ও দুর্ঘটনা ডেস্ক

সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানের ভয়াবহ মুখোমুখি সংঘর্ষে একই পরিবারের সদস্যসহ মোট আটজন নির্মাণশ্রমিক নিহত হয়েছেন। আজ রোববার ভোর ৬টার দিকে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের তেলিবাজার এলাকায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে নিহতের তালিকায় রয়েছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুটামারা গ্রামের বাসিন্দা বদরুজ্জামান (৪৫)। একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার স্ত্রী হাফিজা বেগম (২৮)। এই দম্পতির চার শিশুসন্তান এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, সিলেট নগরের আম্বরখানা এলাকা থেকে একটি মিক্সার মেশিন ও প্রায় ২০ জন নির্মাণশ্রমিক নিয়ে একটি পিকআপ ভ্যান দক্ষিণ সুরমার লালাবাজারের দিকে যাচ্ছিল। পিকআপটি তেলিবাজার এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগামী কাঁঠালবোঝাই ট্রাকের সঙ্গে সেটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের তীব্রতায় পিকআপে থাকা শ্রমিকরা মহাসড়কের ওপর ছিটকে পড়েন। ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন প্রাণ হারান এবং হাসপাতালে নেওয়ার পথে ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়ায়।

নিহত বদরুজ্জামানের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, উন্নত জীবনের আশায় প্রায় দুই বছর আগে তিনি সপরিবারে সিলেটে পাড়ি জমিয়েছিলেন। নগরীর শামীমাবাদ এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে স্বামী-স্ত্রী দুজনেই নির্মাণশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। আজ ভোরেও তারা চার সন্তানকে ঘরে রেখে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছিলেন। দুর্ঘটনায় বদরুজ্জামান প্রাণ হারালেও তার স্ত্রী হাফিজা বেগম গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তার মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। তবে হাফিজা এখনো তার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ জানেন না। হাসপাতালের শয্যায় শঙ্কা নিয়ে তিনি তার স্বামীর সুস্থতা কামনা করছেন।

এদিকে মর্মান্তিক এই ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বদরুজ্জামানের চার শিশুসন্তান। তিন ছেলে ও এক মেয়ের এই ক্ষুদ্র পরিবারটি এখন অভিভাবকহীন হওয়ার শঙ্কায়। হাসপাতালের বারান্দায় শিশুগুলোর নির্বাক উপস্থিতি উপস্থিত জনতা ও চিকিৎসকদের ব্যথিত করে তুলছে। নিহত বদরুজ্জামানের আত্মীয়রা জানান, সন্তানদের ভবিষ্যৎ ও ভরণপোষণ নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন।

একই দুর্ঘটনায় সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মুক্তিখলা গ্রামের দুই ভাই আজির উদ্দিন (৩৫) ও আমির উদ্দিন (২২) প্রাণ হারিয়েছেন। তারা দীর্ঘ এক দশক ধরে সিলেট নগরের সুবিদবাজার এলাকায় বসবাস করে নির্মাণশ্রমিকের কাজ করে আসছিলেন। মর্গে তাদের মরদেহ শনাক্ত করেন স্বজনরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর পেয়ে স্বজনরা হাসপাতালে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। একসঙ্গে দুই উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে পরিবারটি এখন দিশেহারা।

সিলেটের এই মহাসড়কে ভোরে বা রাতে পণ্যবাহী ট্রাকের বেপরোয়া গতি ও শ্রমিক পরিবহনে অনিরাপদ যানবাহনের ব্যবহার দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। বিশেষ করে খোলা পিকআপে করে অনিরাপদভাবে শ্রমিক যাতায়াতের বিষয়টি এই দুর্ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মহাসড়কে নিরাপত্তা তদারকি বৃদ্ধি এবং শ্রমিক পরিবহনের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বাস্তবায়ন না হলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু রোধ করা কঠিন হবে।

সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। নিহতদের মরদেহ ময়নাতদন্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করার প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, পুলিশ দুর্ঘটনা কবলিত ট্রাক ও পিকআপটি জব্দ করেছে এবং এই ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মৃত শ্রমিকদের অধিকাংশেরই বাড়ি সুনামগঞ্জ ও সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় হওয়ায় পুরো অঞ্চলে এখন শোকের ছায়া বিরাজ করছে।

শীর্ষ সংবাদ সারাদেশ