মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে সোর্স হত্যা: ২৭ বছর পর ২ পুলিশসহ ৩ জনের যাবজ্জীবন

মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে সোর্স হত্যা: ২৭ বছর পর ২ পুলিশসহ ৩ জনের যাবজ্জীবন

অপরাধ ডেস্ক

রাজধানীর মিন্টু রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) কার্যালয়ের অভ্যন্তরে চালক ও পুলিশের সোর্স জালাল আহমেদ শফিকে হত্যার ২৭ বছর পর রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। এ মামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ তিন আসামিকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ঢাকার চতুর্থ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মোসাদ্দেক মিনহাজ গত বৃহস্পতিবার এই আদেশ দেন।

সাজাপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন—তৎকালীন হাবিলদার মো. বিল্লাল হোসেন, কনস্টেবল মো. আবদুর রউফ এবং ডিবি কার্যালয় ক্যান্টিনের পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন। রায় ঘোষণার সময় আসামিরা পলাতক থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানাসহ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ শেষে আদালত এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

মামলার বিবরণী ও প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, নিহত জালাল আহমেদ শফি পেশায় একজন মাইক্রোবাস চালক ছিলেন। ডিবি পুলিশ গাড়ি রিকুইজিশন করলে তিনি চালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন এবং সেই সুবাদে ডিবি কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। তিনি ডিবির তৎকালীন ইন্সপেক্টর জিয়াউল আহসানের সোর্স হিসেবেও কাজ করতেন। ১৯৯৯ সালের ২০ মার্চ রাত ৩টার দিকে মোহাম্মদপুরের লালমাটিয়ার বাসা থেকে ডিবি অফিসের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর তিনি নিখোঁজ হন। পরবর্তীতে ৩১ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে তার মরদেহ শনাক্ত করেন স্বজনরা।

তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এই হত্যাকাণ্ডের মূলে ছিল স্বর্ণ ও মাদক চোরাচালানের ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধ। ডিবি ইন্সপেক্টর জিয়াউল আহসানের হয়ে জালাল আহমেদ শফি চোরাচালানের তথ্য সংগ্রহ করতেন। সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে অবৈধ পণ্য জব্দ করা হলেও জালালকে প্রাপ্য ভাগ থেকে বঞ্চিত করা হতো। ১৯৯৯ সালের ১৩ মার্চ বিমানবন্দর এলাকার একটি স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের তথ্য ডিবি পুলিশের অন্য একটি দলকে প্রদান করেন জালাল। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে জিয়াউল আহসান ও তার সহযোগীরা ১৯ মার্চ রাতে তাকে ডেকে নিয়ে ডিবি কার্যালয়ের ভেতরেই পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেন। হত্যার পর মরদেহ গুম করার চেষ্টাও করা হয়েছিল।

ঘটনার পর রমনা থানার উপ-পরিদর্শক এস এম আলী আজম সিদ্দিকী অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। পরবর্তীতে মরদেহের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর নিহত জালালের ছেলে আব্বাস উদ্দিন ১৯৯৯ সালের ৪ এপ্রিল পৃথক একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মুন্সী আতিকুর রহমান তদন্ত শেষে ১৯৯৯ সালের ২৬ ডিসেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে আদালত প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত সাক্ষ্য এবং পারিপার্শ্বিক তথ্যপ্রমাণ আমলে নিয়ে আসামিদের দোষী সাব্যস্ত করেন।

আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডিবি কার্যালয়ের মতো একটি সুরক্ষিত স্থানে খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে সোর্স খুনের ঘটনায় এই রায় বিচারহীনতার সংস্কৃতি রোধে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও অপরাধীরা যে শেষ পর্যন্ত পার পায় না, এই রায়ের মাধ্যমে তা পুনরায় প্রমাণিত হলো। তবে মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে নাম আসা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়ে উচ্চতর তদন্ত ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিতের দাবিও উঠেছে এই রায়ের পর। আদালত পলাতক দণ্ডপ্রাপ্তদের অনতিবিলম্বে গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ