বিমান, জাহাজ ও পর্যটন খাতের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা

বিমান, জাহাজ ও পর্যটন খাতের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা

 

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

দেশের বিমান, জাহাজ, ট্যুর অপারেটর ও কুরিয়ার সার্ভিস খাতের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন প্রক্রিয়া সহজতর করতে নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বিভিন্ন সময়ে জারি করা বিচ্ছিন্ন নিয়মগুলোকে একত্রিত করে একটি সমন্বিত ও স্বচ্ছ কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই উদ্যোগের ফলে বিদেশে অর্থ পাঠানো এবং বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব পরিচালনার প্রক্রিয়া আগের চেয়ে দ্রুত ও সহজ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ থেকে এই সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়। নতুন এই নীতিমালায় বিদেশগামী যাত্রীদের টিকিট ইস্যু, পণ্য পরিবহনের ভাড়া (ফ্রেইট) আদায়, বিদেশি এয়ারলাইনস ও শিপিং কোম্পানির আয় বিদেশে পাঠানো এবং ট্যুর অপারেটরদের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সার্কুলার অনুযায়ী, বাংলাদেশে কর্মরত বিদেশি এয়ারলাইনস ও শিপিং কোম্পানিগুলো তাদের অর্জিত আয় থেকে স্থানীয় পর্যায়ের ব্যয় এবং সরকারি কর পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ বিদেশে পাঠাতে পারবে। তবে এক্ষেত্রে একটি বিশেষ সতর্কতা নিশ্চিত করা হয়েছে; সম্ভাব্য টিকিট রিফান্ড বা অর্থ ফেরতের প্রয়োজনীয়তা মেটাতে মোট আয়ের অন্তত ১০ শতাংশ অর্থ সবসময় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবে সংরক্ষণ করতে হবে। এই বাধ্যবাধকতা মূলত গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করার জন্য রাখা হয়েছে।

ডিজিটাল লেনদেনের প্রসারে অনলাইন টিকিট বিক্রির ক্ষেত্রেও নতুন সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। এখন থেকে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে টিকিট বিক্রির অর্থ আন্তর্জাতিক ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে জমা রাখা যাবে। এছাড়া ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার, এয়ারলাইনস এবং শিপিং কোম্পানিগুলো পৃথক বৈদেশিক মুদ্রা হিসাব খুলে আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের পরিবহন সংক্রান্ত যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ করতে পারবে। এর ফলে ব্যবসায়িক লেনদেনে ডলারের প্রাপ্যতা এবং তারল্য ব্যবস্থাপনা আরও গতিশীল হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটন খাতের বিকাশে ট্যুর অপারেটরদের জন্যও নীতিমালায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিদেশগামী ভ্রমণকারীরা তাদের বার্ষিক ভ্রমণ কোটার (এনটাইটেলমেন্ট) সর্বোচ্চ ৯০ শতাংশ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহার করে ট্যুর প্যাকেজ কিনতে পারবেন। এর মাধ্যমে পর্যটন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় পেমেন্ট গ্রহণ করতে পারবে। অন্যদিকে, বিদেশি পর্যটকদের সেবা দিয়ে অর্জিত অর্থের একটি নির্দিষ্ট অংশ অপারেটররা নিজস্ব বৈদেশিক মুদ্রা হিসাবে সংরক্ষণ করার সুযোগ পাবেন, যা তাদের আন্তর্জাতিক বিপণন ও সেবা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

কুরিয়ার সার্ভিস খাতের ক্ষেত্রেও বৈদেশিক মুদ্রা পরিশোধের প্রক্রিয়াকে আরও নিয়মবদ্ধ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক পার্সেল ও নথিপত্র আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে বিদেশি মূল প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্য অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া এখন থেকে এই সমন্বিত নির্দেশনার অধীনে সম্পন্ন হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, এই নতুন নির্দেশনাবলী আপাতত এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে। তবে এই সময়ের মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা সংক্রান্ত নতুন কোনো সার্কুলার জারি হলে তা এই কাঠামোর অংশ হিসেবেই বিবেচিত হবে। মূলত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা আনা এবং আন্তর্জাতিক পরিবহন ও পর্যটন ব্যবসার ব্যয় সহজ করাই এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে এবং একই সঙ্গে বৈধ পথে লেনদেন উৎসাহিত করতে এই ধরনের সমন্বিত নীতিমালা অত্যন্ত জরুরি ছিল। এর ফলে সেবামূলক খাতগুলোতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। তবে এই নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ