মেহেরপুরে শিশু ধর্ষণ মামলায় যুবকের মৃত্যুদণ্ড, রেকর্ড ২৯ কার্যদিবসে রায় প্রকাশ

মেহেরপুরে শিশু ধর্ষণ মামলায় যুবকের মৃত্যুদণ্ড, রেকর্ড ২৯ কার্যদিবসে রায় প্রকাশ

অপরাধ ও আদালত ডেস্ক

মেহেরপুরে ১১ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের চাঞ্চল্যকর মামলায় শাকিল হোসেন (২২) নামের এক যুবককে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের বিচারিক ইতিহাসে রেকর্ড মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে এই মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রায় ঘোষণা করা হলো।

আজ রবিবার দুপুর দেড়টার দিকে মেহেরপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের (জেলা শিশু সহিংসতা দমন আদালত) বিচারক মো. তাজুল ইসলাম জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন। দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শাকিল হোসেন মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের আব্দাল হাসানের ছেলে। রায় ঘোষণার সময় আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন।

মামলার বিবরণ ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৬ জুন গাংনী উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া এক শিশু তার বাবাকে বাড়ির পাশের মাঠে দুপুরের খাবার দিতে যাচ্ছিল। পথে একই গ্রামের শাকিল হোসেন শিশুটির গতিরোধ করে এবং দেশীয় অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পাশের একটি পাটখেতে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। ঘটনার পর শিশুটি বাড়িতে ফিরে পরিবারকে বিষয়টি অবহিত করলে তার বাবা ইছানুল হক বাদী হয়ে গাংনী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের পর তৎকালীন তদন্তকারী কর্মকর্তা অভিযান চালিয়ে আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করেন।

আইনি প্রক্রিয়া ও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যালোচনায় দেখা যায়, অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে আদালত অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে মামলার কার্যক্রম এগিয়ে নেন। রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি-তর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে ১১ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেন। আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে কয়েকজন সাক্ষীর সাক্ষ্য ভার্চুয়ালি ভিডিও কলের মাধ্যমে এবং বাকিদের সশরীরে আদালতে উপস্থিত করে রেকর্ড করা হয়। চিকিৎসা প্রতিবেদন, পরিপার্শ্বিক সাক্ষ্য ও পারিপার্শ্বিক তথ্য-প্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের পর আদালত আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত পাওয়ায় এই সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করেন।

এই রায়ের বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এবং মেহেরপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান তুহিন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক রায়। আইনগত প্রক্রিয়া ও প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয়ে মাত্র ২৯ কার্যদিবসে বিচার সম্পন্ন হওয়া দেশের বিচার বিভাগের জন্য একটি মাইলফলক। এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে অপরাধীদের কাছে একটি কঠোর বার্তা যাবে যে, নার ও শিশু নির্যাতনের মতো জঘন্য অপরাধ করে কেউ পার পাবে না।” রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার আদালতের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

অন্যদিকে, আসামি পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মারুফ আহমেদ বিজন রায়ের প্রতিক্রিয়ায় জানান, তারা এই রায়ে সংক্ষুব্ধ এবং ন্যায়বিচারের আশায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করবেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে সাধারণত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলাগুলো দীর্ঘ সময় ধরে ঝুলে থাকে। সাক্ষী সময়মতো আদালতে না আসা এবং দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়ার কারণে বিচার প্রাপ্তিতে বিলম্ব ঘটে। এই প্রেক্ষাপটে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে ভার্চুয়াল ও সরাসরি সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে মেহেরপুরের আদালত যে নজির স্থাপন করল, তা দেশের সামগ্রিক বিচার ব্যবস্থার গতি ত্বরান্বিত করতে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যতে এ ধরনের সংবেদনশীল মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি দৃষ্টান্ত (Precedent) হিসেবে বিবেচিত হবে।

আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ