হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধমুক্ত ইরানি তেলবাহী জাহাজ, বিশ্ববাজারে পতন

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধমুক্ত ইরানি তেলবাহী জাহাজ, বিশ্ববাজারে পতন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনা সামনে রেখে মধ্যপ্রাচ্য ভূরাজনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। ওমান উপসাগর ও স্ট্রেইট অব হরমোজ (হরমুজ প্রণালি) এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর প্রায় দুই মাস ধরে জারি রাখা অবরোধ ভেঙে ইরানের দুটি বিশাল তেলবাহী জাহাজ বের হয়ে গেছে। গত দুই মাসের মধ্যে এটিই ইরানের প্রথম অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানির ঘটনা। এই অগ্রগতির পরপরই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দামে বড় পতন লক্ষ্য করা গেছে। তবে শান্তিচুক্তির খসড়া তৈরি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক মতবিরোধের কারণে চূড়ান্ত সফলতার পথ এখনো পুরোপুরি মসৃণ নয় বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

বিশ্বজুড়ে তেল পরিবহন ও সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা ‘ট্যাঙ্কারট্র্যাকার্স’-এর তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দুই মাস অবরুদ্ধ থাকার পর ইরানের তেলবাহী সুপারট্যাঙ্কারগুলো পুনরায় চলাচল শুরু করেছে। স্যাটেলাইট চিত্র এবং স্বয়ংক্রিয় ট্র্যাকিং ডেটা পর্যালোচনা করে সংস্থাটি নিশ্চিত করেছে যে, ন্যাশনাল ইরানিয়ান ট্যাঙ্কার কোম্পানির (এনআইটিসি) মালিকানাধীন ‘ডিওনা’ এবং ‘হিরো-২’ নামের দুটি বিশালাকার জাহাজ মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ সীমা অতিক্রম করেছে। এই দুটি জাহাজে মোট প্রায় ৩৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত ইরানি তেল রয়েছে। পরবর্তীতে আরও একটি তেলবাহী জাহাজ ওই অঞ্চল ত্যাগ করতে সক্ষম হয়। জ্বালানি নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় বাণিজ্য শুরু হওয়ার এই প্রাথমিক লক্ষণটি বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি বড় স্বস্তির বার্তা।

দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার অবসান ঘটাতে আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টক পাহাড়ি রিসোর্টে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের মধ্যে একটি চূড়ান্ত শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর ও আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, এই শীর্ষ বৈঠকের পর একটি মধ্যস্থতাকারী কাঠামোর অধীনে পরবর্তী ৬০ দিন ধরে উভয় দেশের মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় ও বিস্তারিত আলোচনা চলবে। এই দুই মাসব্যাপী নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং দেশটির ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা শিথিলকরণের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর স্থায়ী সমাধান খোঁজা হবে।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের আগেই দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক বা চুক্তির রূপরেখায় বৈদ্যুতিন (ইলেকট্রনিক) উপায়ে সই করেছেন। এই ঐতিহাসিক খসড়া দলিলে স্বাক্ষর করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং ইরানের পক্ষে দেশটির উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাজিদ তাখত-রাভানচি ও প্রধান পরমাণু আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ। প্রাথমিক খসড়া অনুযায়ী, শান্তি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর থেকে জ্বালানি বিক্রির নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করতে পারে, যার সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক ব্যাংকিং খাত, আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহন এবং সামুদ্রিক বিমা (ইন্স্যুরেন্স) সেবার ওপর।

মার্কিন-ইরান এই আকস্মিক বরফ গলার খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার তাৎক্ষণিক প্রভাব দেখা গেছে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার প্রত্যাশায় বুধবার আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি কমে ৭৮.৭৪ ডলারে নেমে এসেছে। একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজার সূচক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) তেলের দামও উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৫.৮৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ সচল হলে তেলের দাম আরও কমতে পারে।

তবে এই শান্তি প্রক্রিয়ার সমান্তরালে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো চরম ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে। লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর নতুন করে চালানো বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে নতুন করে জটিল করে তুলেছে। ইরান এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে হুশিয়ারি দিয়েছে যে, আঞ্চলিক উসকানির বিরুদ্ধে তারা কঠোর জবাব দেওয়ার অধিকার রাখে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, লেবানন সীমান্তে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর এই নতুন সংঘাত আসন্ন সুইজারল্যান্ড শান্তি আলোচনার টেবিলে সবচেয়ে বড় বাধা বা অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পাশাপাশি, চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপও একটি বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী ও রক্ষণশীল রিপাবলিকান রাজনীতিকরা এই খসড়া চুক্তির স্থায়িত্ব ও কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তারা হোয়াইট হাউসের কাছে চুক্তির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ এবং ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের স্পষ্ট গ্যারান্টি দাবি করছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শুক্রবার থেকে শুরু হতে যাওয়া নতুন দফার কূটনৈতিক আলোচনাকে স্বাগত জানালেও সার্বিক বিষয়ে সতর্ক অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি মনে করিয়ে দেন, অতীতে পশ্চিমা দেশগুলোর একাধিকবার চুক্তি লঙ্ঘন ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের তিক্ত অভিজ্ঞতা তেহরানের রয়েছে। ফলে ইরান এবার অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রতিটি পদক্ষেপ মূল্যায়ন করছে এবং চূড়ান্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বাস্তব প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত তাদের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করবে না।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ