বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণ

বরেণ্য চিত্রশিল্পী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণ

সংস্কৃতি ডেস্ক

বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব, বরেণ্য চিত্রশিল্পী এবং একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার (২৯ জুন) সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তার মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছে পারিবারিক সূত্র।

পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শারীরিক অসুস্থতা তীব্রতর হলে গত ১৪ জুন তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানান, তিনি ফুসফুসে নিউমোনিয়ার ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছিলেন। হাসপাতালে ভর্তির পর থেকেই তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। দীর্ঘ দুই সপ্তাহ ধরে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সোমবার সকালে তিনি মারা যান।

এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রোস্টেট ক্যানসারের জটিলতা নিয়ে এই শিল্পীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। সে সময় শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে তাকে লাইফ সাপোর্টেও রাখা হয়। পরবর্তীতে ভারতের দিল্লিতে উন্নত চিকিৎসার পর তিনি কিছুটা সুস্থ হয়ে দেশে ফিরেছিলেন। ক্যানসারের সাথে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর সাম্প্রতিক নিউমোনিয়ার সংক্রমণ তার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় বলে চিকিৎসকদের ধারণা।

মুস্তাফা মনোয়ারের প্রয়াণে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও শিল্পাঙ্গনে একটি অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হলো। বাংলাদেশে পাপেট বা পুতুলনাচের বিকাশ এবং একে শিল্পের মর্যাদায় উন্নীত করার ক্ষেত্রে তাকে ‘পাপেট ম্যান’ বা পুতুলনাচের জাদুকর বলা হয়। তার হাত ধরেই এ দেশে আধুনিক পাপেট থিয়েটারের সূচনা হয়েছিল, যা গ্রামীণ লোকসংস্কৃতির সাথে আধুনিকতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) সূচনালগ্ন থেকে তিনি শিশুতোষ অনুষ্ঠান নির্মাণে যে অনন্য ভূমিকা রেখেছিলেন, তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মনের আলো ছড়ানো পাপেট শোর মাধ্যমে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ও নৈতিক শিক্ষার প্রসারে তার অবদান ছিল অসামান্য।

দীর্ঘ কর্মজীবনে মুস্তাফা মনোয়ার চিত্রকলা, চারুকলা শিক্ষা, টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং নাট্য নির্দেশনায় অনন্য মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন। তিনি চারুকলা ইনস্টিটিউটের (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ) অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নতুন প্রজন্মের বহু শিল্পীকে অনুপ্রাণিত করেছেন। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক এবং জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক হিসেবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।

শিল্পকলা ও সংস্কৃতিতে তার এই অসামান্য, বহুমুখী এবং দীর্ঘকালীন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ২০০৪ সালে তাকে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত করে। এ ছাড়া কর্মজীবনে তিনি বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার এবং সম্মাননা লাভ করেছেন।

তার প্রয়াণে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক মহলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক সংগঠন তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে। বাংলাদেশের চিত্রশিল্পের আধুনিকায়ন এবং শিশুদের মননশীলতা গঠনে মুস্তাফা মনোয়ারের দর্শন ও সৃষ্টিশীল কাজ আগামী দিনগুলোতেও পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করবে। তার মরদেহ সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য জাতীয়ভাবে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা এবং পরবর্তীতে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাফন কার্য সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

বিনোদন শীর্ষ সংবাদ