কূটনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ডেস্ক
বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সামরিক সহযোগিতা আরও নিবিড় করার পাশাপাশি দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে উভয় দেশ ঐকমত্য পোষণ করেছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলামের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সৌজন্য সাক্ষাতে এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত সশস্ত্র বাহিনী বিভাগে প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার কার্যালয়ে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী, ঐতিহাসিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়নে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকের মূল আলোচ্যসূচির মধ্যে ছিল বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য চীনে উচ্চতর প্রশিক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করা। প্রতিরক্ষা খাতে বাংলাদেশের স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে চীন কীভাবে আরও কার্যকর অবদান রাখতে পারে, সে বিষয়ে দুই কর্মকর্তা বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। বিশেষ করে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রথাগত সামরিক সহযোগিতার পরিধি বাড়িয়ে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খাতের দিকে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ও চীনা রাষ্ট্রদূতের এই বৈঠকে সাইবার স্পেসের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি অন্যতম গুরুত্ব লাভ করে। বর্তমান যুগে সাইবার নিরাপত্তা যেকোনো দেশের জাতীয় সার্বভৌমত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সুরক্ষায় একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে উভয় পক্ষ একমত হয়েছে। এটি দুই দেশের সামরিক কূটনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
আলোচনায় বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়টিও উঠে আসে। এ অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় উভয় দেশ আগামী দিনগুলোতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়নে চীনের ধারাবাহিক ও জোরালো সহযোগিতার ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে, চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বর্তমান সরকারের গৃহীত বিভিন্ন বাস্তবমুখী পদক্ষেপ ও দূরদর্শী পরিকল্পনার প্রশংসা করেন। তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতের এই অগ্রযাত্রায় চীনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি ও সামরিক সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। দুই দেশের এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক কেবল সামরিক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সামগ্রিক আঞ্চলিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে গভীর সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক বিদ্যমান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশের সামরিক সরঞ্জাম ও লজিস্টিকস সহায়তা চীন থেকে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। আজকের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকটি দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান সেই আস্থার সম্পর্ককে আরও সুসংহত করবে এবং কৌশলগত অংশীদারিত্বের পরিধিকে আরও বিস্তৃত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চতর প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে তা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করবে।


