সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রীর

সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও জলবায়ু সহনশীল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় প্রধানমন্ত্রীর

জাতীয় ডেস্ক

একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন এবং জলবায়ু সহনশীল টেকসই বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উন্নয়ন ও পরিবেশকে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে না দেখে, প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রেখে টেকসই সমৃদ্ধি গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক অভিঘাত সফলভাবে মোকাবিলায় আগামী পাঁচ বছরে সারা দেশে নতুন করে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের একটি মেগা প্রকল্প ঘোষণা করেছেন সরকারপ্রধান।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘বিশ্ব পরিবেশ দিবস ও পরিবেশ মেলা-২০২৬’ এবং ‘জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা-২০২৬’-এর যৌথ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি পরিবেশ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নাগরিক সচেতনতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

পরিবেশ সুরক্ষায় বিগত সরকারের নীতি ও বাস্তবায়নের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পে বৃক্ষরোপণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অসংগতি ও জালিয়াতির চিত্র তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, চট্টগ্রাম থেকে হাটহাজারী-ডুলাহাজারা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পে কয়েক লাখ গাছ কেটে ফেলা হয়েছিল। বিগত সরকারের নথিপত্রে সেখানে সাত লাখ গাছ রোপণের দাবি করা হলেও, সরেজমিনে তদন্ত ও যাচাই-বাছাই করে বড়জোর দুই লাখ গাছের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। সরকারি প্রকল্পে এই ধরনের জালিয়াতি ও অপচয়কে অত্যন্ত দুঃখজনক ও গ্রহণযোগ্য নয় বলে বর্ণনা করেন তিনি।

টেকসই পরিবেশের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বর্তমান সরকারের নতুন নতুন নীতিগত পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং পরিবেশ সচেতন সমাজ গঠনে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করতে ‘ক্লাইমেট ইয়ুথ ফেলোশিপ’ এবং পরিবেশবান্ধব উদ্যোক্তা তৈরিতে ‘এনভায়রনমেন্ট স্টার্টআপ ফান্ড’ গঠনসহ বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

যত্রতত্র এবং অপরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোর ক্ষতিকর দিক তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী দেশের মাটি ও জলবায়ুর উপযোগী বৃক্ষরোপণের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, শুধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য ইচ্ছামতো গাছ রোপণ করলে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ক্ষতি হতে পারে। পরিবেশের বৈচিত্র্য অনুযায়ী সঠিক স্থানে সঠিক প্রজাতির গাছ নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। অতীতে নব্বইয়ের দশকে রোপণ করা ইউক্যালিপটাস বা আকাশমণির মতো বিদেশি প্রজাতিগুলো দেশীয় ভূগর্ভস্থ পানি ও মাটির পুষ্টি উপাদানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক প্রমাণিত হয়েছে। এর পরিবর্তে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় দেশীয় প্রজাতির ওষুধি, অর্কিড, বাঁশ জাতীয় বনজ, ফলদ এবং বিলুপ্তপ্রায় ও বিপন্ন প্রজাতির গাছ রোপণে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করার আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও নদীমাতৃক অববাহিকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি হ্রাসে সরকার ইতিমধ্যে সারা দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী ও খাল খনন এবং পুনঃখননের একটি ব্যাপক কর্মসূচি শুরু করেছে। এই উদ্যোগ দেশের সামগ্রিক সেচ ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর উন্নতকরণ এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকা রাখবে।

দেশের পরিবেশ দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তনের তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বর্জ্য অপসারণ বা পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার কাজটি শুধু নগর প্রশাসন কিংবা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা দিয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রতিটি নাগরিকের ব্যক্তিগত সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। যত্রতত্র আবর্জনা ফেলার মানসিকতা পরিহারের আহ্বান জানিয়ে তিনি নিজের একটি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় এক যুবককে রাস্তায় প্লাস্টিকের প্যাকেট ছুড়ে ফেলতে দেখা গেছে। দেশের পরিবেশকর্মী ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধরনের আচরণগত পরিবর্তনের লক্ষ্যে জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন জোরদার করার অনুরোধ জানান তিনি।

জীববৈচিত্র্য রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী পশুপাখি ও কীটপতঙ্গ রক্ষায় সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জীবজগতের প্রতি অবহেলা বা নিষ্ঠুরতা বন্ধ করতে হবে। প্রকৃতিতে কোনো একটি পোকা বা মাকড়সা দেখলেই তা মেরে ফেলা কিংবা পাখিকে ঢিল মারার প্রবণতা বন্ধে শৈশব থেকেই শিশুদের মানবিক শিক্ষা ও পরিবেশ সচেতনতা শেখানো উচিত। প্রতিটি ছোট প্রাণীর অস্তিত্বই প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল ও ভারসাম্য রক্ষার জন্য অপরিহার্য।

পরিশেষে, দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সুরক্ষার মধ্যে একটি সুষম ভারসাম্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবেশের ক্ষতি করে কোনো উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না। প্রকৃতির সঙ্গে সম্প্রীতি বজায় রেখে যে উন্নয়ন সাধিত হয়, সেটিই বর্তমান সরকারের মূল দর্শন। বাংলাদেশ যেন মানুষের পাশাপাশি সব প্রাণী এবং উদ্ভিদের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য আবাসস্থলে পরিণত হতে পারে, সেই লক্ষ্যে দলমত নির্বিশেষে সর্বস্তরের জনগণকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ