জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্রুত ও নিরাপদ উপায়ে নিজ দেশ মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর ও জোরাল ভূমিকা চেয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং বৈশ্বিক অপরাধীচক্রের নেটওয়ার্ক দমনে বিশ্বনেতৃত্বের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
স্থানীয় সময় বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে আয়োজিত পৃথক দুটি উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই আহ্বান জানান। সফরকালে তিনি জাতিসংঘের রাজনৈতিক ও শান্তি বিনির্মাণবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রোজমেরি এ ডি-কার্লোর সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন। এর পাশাপাশি তিনি জাতিসংঘ পুলিশ প্রধানদের পঞ্চম সম্মেলনে (ইউএনকপস ২০২৬) বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন।
জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল রোজমেরি এ ডি-কার্লোর সঙ্গে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বৈশ্বিক শান্তি রক্ষা ও শান্তি বিনির্মাণে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদান ও প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। বৈঠকে আলোচনার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল বাংলাদেশে চলমান রোহিঙ্গা সংকট। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালে মিয়ানমারে সামরিক অভিযানের মুখে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছিল। তবে দীর্ঘ প্রায় এক দশকেও এই সংকটের টেকসই সমাধান না হওয়ায় এটি এখন কেবল বাংলাদেশের একক সমস্যা নয়, বরং সামগ্রিক আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ ও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও জানান, রোহিঙ্গা শিবিরের দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান স্থানীয় অর্থনীতি, পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করছে। এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে এবং রোহিঙ্গাদের তাদের মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। জবাবে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের মানবিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করা হয় এবং এই সংকট সমাধানে বিশ্বসংস্থার সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেওয়া হয়।
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত পঞ্চম ইউনাইটেড নেশনস চিফস অব পুলিশ সামিট বা ‘ইউএনকপস ২০২৬’-এ অংশ নেন। আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনে তিনি বিশ্বজুড়ে অপরাধের পরিবর্তিত ধরন এবং তা মোকাবিলায় আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশ যেমন মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, ঠিক তেমনি অপরাধ জগতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। অপরাধীচক্রগুলো এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলছে। এর ফলে সাইবার অপরাধ, মানবপাচার, অর্থ পাচার এবং মাদক চোরাচালানের মতো আন্তঃদেশীয় অপরাধের মাত্রা বহুগুণ বেড়ে গেছে। এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রথাগত বা ঐতিহ্যবাহী পুলিশিং ব্যবস্থা আর যথেষ্ট নয়। বিশ্বজুড়ে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পুলিশিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন, আধুনিকায়ন এবং বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি।
জাতিসংঘের এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে পাঁচ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। প্রতিনিধিদলের অন্যতম সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরও সম্মেলনে অংশ নেন। সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি পুলিশ সদস্যদের পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার চিত্র তুলে ধরা হয় এবং ভবিষ্যতে বিশ্বশান্তি রক্ষায় আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের এই উচ্চপর্যায়ের সফর ও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলো আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রোহিঙ্গা সংকটকে পুনরায় আলোচনায় নিয়ে আসতে এবং বৈশ্বিক অপরাধ দমনে বাংলাদেশের নেতৃত্বশীল অবস্থান তুলে ধরতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।


