আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তিব্বতে চীনের দমনমূলক নীতি এবং তিব্বতি কর্মী লোবগা রাংজেনের আত্মাহুতির ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর পদক্ষেপের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে বিক্ষোভ করেছেন অধিকারকর্মীরা। ‘স্টুডেন্টস ফর অ্যা ফ্রি তিব্বত’ (এসএফটি) নামক সংগঠনের তিন সদস্য জাতিসংঘ সদর দপ্তরের মূল ফটকে নিজেদের শিকল দিয়ে বেঁধে এই প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেন। তিব্বতি কর্মী লোবগা রাংজেনের জাতিসংঘ ভবনের সামনে আত্মাহুতি দেওয়ার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে এই বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়।
বিক্ষোভকারীদের প্রধান অভিযোগ, রাংজেনের আত্মাহুতির মতো চরম ঘটনার পরও তিব্বতের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘ এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যদিও ঘটনার পর জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক একে ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক’ বলে উল্লেখ করে গভীর শোক প্রকাশ করেছিলেন। তবে আন্দোলনকারীদের দাবি, আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহের কেবল আনুষ্ঠানিক সমবেদনা প্রকাশই যথেষ্ট নয়; বরং মাঠপর্যায়ে এর সুনির্দিষ্ট প্রতিফলন প্রয়োজন।
এই কর্মসূচির মাধ্যমে বিক্ষোভকারীরা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্কের প্রতি তিব্বতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সাথে তিব্বতে স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্তকারীদের অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করা এবং চীনের কথিত পদ্ধতিগত দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে কার্যকর বৈশ্বিক চাপ প্রয়োগের তাগিদ দেওয়া হয়। বিক্ষোভ চলাকালে স্থানীয় তিব্বতি সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক সমর্থক সেখানে সমবেত হয়ে আন্দোলনকারীদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
জাতিসংঘ ভবনের একটি অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শনের কারণে নিউইয়র্ক সিটি পুলিশ (এনওয়াইপিডি) তেনজিন তসেতেন, তসেলা জোকসাং এবং তেনজিন কুনচক নামের তিন বিক্ষোভকারীকে আটক করে। পরবর্তীতে তাদের মুচলেকা বা প্রাথমিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হলেও, তাদের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাধা সৃষ্টি ও বেআইনি সমাবেশের মতো একাধিক আইনি অভিযোগ আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিক্ষোভ চলাকালীন এসএফটির ক্যাম্পেইন পরিচালক তসেলা জোকসাং গণমাধ্যমকে জানান, তিব্বতের নিজস্ব জাতিগত পরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর বেইজিংয়ের দীর্ঘদিনের চলমান দমননীতির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আকর্ষণ করাই ছিল এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। তিব্বতি অধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, চীনা শাসনের প্রতিবাদে এবং স্বাধিকারের দাবিতে গত কয়েক বছরে অন্তত ১৭০ জন তিব্বতি আত্মাহুতির পথ বেছে নিয়েছেন, যা এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংকটের তীব্রতা নির্দেশ করে।
এর পাশাপাশি, বিক্ষোভকারীরা ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া চীনের নতুন ‘এথনিক ইউনিটি অ্যান্ড প্রগ্রেস আইনের’ তীব্র সমালোচনা করেন। তিব্বতি অ্যাক্টিভিস্টদের মতে, এই বিতর্কিত আইনটি মূলত তিব্বতে চীনা একীভূতকরণ নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার একটি অপচেষ্টা। এর ফলে তিব্বতি শিশুদের জোরপূর্বক মান্দারিন ভাষার আবাসিক বিদ্যালয়ে পাঠানো, যাযাবর তিব্বতি জনগোষ্ঠীর চিরাচরিত জীবনধারা পরিবর্তন এবং সামগ্রিকভাবে তিব্বতি ভাষা, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকে পদ্ধতিগতভাবে দুর্বল করার প্রক্রিয়া আরও বেগবান হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভের ফলে তিব্বত ইস্যুটি বিশ্বমঞ্চে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিতে পারে, যা বেইজিংয়ের ওপর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর চাপ বাড়াবে।


