সাবেক স্পিকার ও প্রবীণ রাজনীতিক ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ইন্তেকাল

সাবেক স্পিকার ও প্রবীণ রাজনীতিক ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের ইন্তেকাল

জাতীয় ডেস্ক

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার মারা গেছেন (ইন্না-লিল্লাহি ওয়াইন্না ইলাইহি রাজিউন)। রবিবার (১২ জুলাই) ভোরে রাজধানীর শ্যামলীতে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন ৯৪ বছর বয়সী দেশের এই প্রবীণ আইনবিদ ও রাজনীতিক। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্ষেত্র ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিসহ আইন অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এক অনন্য নাম। বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের অধিকারী এই প্রবীণ ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন মেয়াদে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভূমি এবং গণপূর্ত ও নগর উন্নয়ন मंत्रालয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সাথে তিনি মোট পাঁচবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। দেশের দুই শীর্ষ সংকটে তিনি ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক দায়িত্ব সুচারুরূপে পালন করেছিলেন।

ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ১৯৩১ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া উপজেলার নয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মৌলভী মুহম্মদ আজিজ বক্স এবং মা বেগম ফখরুন্নেছা। পঞ্চগড়েই তাঁর শৈশব ও প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন হয়। পরবর্তীকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে স্নাতকোত্তর (এমএ) ও আইনবিদ্যায় স্নাতক (এলএলবি) ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে ১৯৬১ সালে তিনি যুক্তরাজ্যে গমন করেন এবং লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লিংকনস ইন থেকে ‘ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল’ ডিগ্রি লাভ করেন। দেশে ফিরে তিনি ঢাকা হাইকোর্ট তথা বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টে আইন পেশা শুরু করেন। দেওয়ানি, ফৌজদারি ও বিশেষ করে সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি দেশের বিচার অঙ্গনে অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক পরিচিতি ও সুনাম অর্জন করেন।

ছাত্রজীবন থেকেই প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন জমির উদ্দিন সরকার। ১৯৪৫ সালে ছাত্র ফেডারেশনের মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি ছাত্র ইউনিয়ন ও ন্যাপের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। সত্তর দশকের শেষভাগে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন নতুন রাজনৈতিক ধারা সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘জাগদল’ গঠন করেন, তখন তিনি তাতে যোগ দেন। এরপর ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দলের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ২০০১ সালের ২৮ অক্টোবর তিনি অষ্টম জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত এই পদে আসীন ছিলেন। স্পিকার হিসেবে সংসদ পরিচালনায় তিনি নিরপেক্ষতা ও নিয়মতন্ত্রের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এর আগে, ২০০২ সালের জুনে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী তিনি ২১ জুন ২০০২ থেকে ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ পর্যন্ত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে রাষ্ট্রপ্রধানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেন। এছাড়া ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর অন্তর্বর্তীকালীন সময়েও তিনি সাময়িকভাবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি ১৯৭৯, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এবং ২০০৯ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন আসন (পঞ্চগড়-১, ঢাকা-৯, বগুড়া-৬ ও দিনাজপুর-১) থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, বিচারপতি আবদুস সাত্তার এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভায় তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় সফলভাবে পরিচালনা করেন।

ব্যক্তিগত জীবনে ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ও তাঁর স্ত্রী নূর আখতারের সংসারে এক কন্যা (নিলুফার জমির) এবং দুই পুত্র (ব্যারিস্টার নওশাদ জমির ও নওফল জমির) রয়েছেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার নওশাদ জমিরও বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে আইন পেশার পাশাপাশি বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতির সাথে যুক্ত রয়েছেন। এই প্রবীণ নেতার প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হলো, যা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, শেরেবাংলা নগরে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজাসহ বিভিন্ন স্থানে জানাজা শেষে মরহুমের শেষ ইচ্ছা ও পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরবর্তী দাফন কার্য সম্পন্ন করা হবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ