হরমুজ প্রণালিতে কন্টেইনার জাহাজে হামলার জেরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের রাতভর বিমান হামলা

হরমুজ প্রণালিতে কন্টেইনার জাহাজে হামলার জেরে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের রাতভর বিমান হামলা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

স্ট্র্যাটেজিক ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর ইরানের ওপর নতুন করে রাতভর বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ইরানের এলিট ফোর্স ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) মাধ্যমে একটি কন্টেইনার জাহাজে আক্রমণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে এই ওয়াশিংটন এই পদক্ষেপ নেয়। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর লক্ষ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত একটি যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) কার্যকর থাকা সত্ত্বেও এই পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের ফলে অঞ্চলটিতে নতুন করে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যত বাতিলের ঘোষণা দিলেও কূটনৈতিক আলোচনার পথ এখনও খোলা রয়েছে বলে জানিয়েছেন।

মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্থানীয় সময় শনিবার সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটে মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর হামলা শুরু করে। মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশেই এই বিশেষ সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ এবং বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পাল্টা হামলা চালানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হলো ইরানের আইআরজিসির উপকূলীয় সক্ষমতা ও আক্রমণাত্মক সামরিক অবকাঠামোগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়া, যাতে তারা আন্তর্জাতিক জলসীমায় মুক্ত জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে।

এর আগে শনিবার দিনের শুরুতে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, একটি বাণিজ্যিক জাহাজ তাদের অনুমোদিত গতিপথ লঙ্ঘন করে ওমানের জলসীমার কাছাকাছি বিকল্প পথ ব্যবহারের চেষ্টা করছিল। আইআরজিসির নৌ শাখা জানায়, বারবার দিক পরিবর্তনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় তারা জাহাজটির ওপর সতর্কতামূলক গুলি ছুড়তে বাধ্য হয়। একই সঙ্গে ইরান আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিটি সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করে। তেহরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই অঞ্চলে মার্কিন ও বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপের সমাপ্তি না ঘটা পর্যন্ত বিশ্ব বাণিজ্যের এই প্রধান রুটটি বন্ধ রাখা হবে। এছাড়া মার্কিন হামলার জবাবে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ও তার মিত্রদের ‘নতুন ঘাঁটিগুলো’ লক্ষ্যবস্তু করা হবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে আইআরজিসি।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, হামলার শিকার হওয়া বাণিজ্যিক জাহাজটি সাইপ্রাসের পতাকাবাহী কন্টেইনার জাহাজ ‘এম/ভি জিএফএস গ্যালাক্সি’। ইরানের আইআরজিসি বাহিনীর চালানো হামলায় জাহাজটির পেছনের অংশ ও ইঞ্জিন রুমে মারাত্মক অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ফলে জাহাজটির ভেতরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং এর ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় এটি সাগরে আটকা পড়েছে। এ ঘটনায় জাহাজটিতে কর্মরত একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে সেন্টকম।

উপসাগরীয় অঞ্চলের এই নতুন সামরিক সংঘাতের ফলে বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিতে ব্যাপক অস্থিরতা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে পরিবাহিত হয়। ইরানের এই অবরোধের সিদ্ধান্তের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির চাপ তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সংঘাতের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আগামী নভেম্বরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত জুন মাসে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে—তা নিয়ে দ্বিমতের কারণেই তা ভেস্তে যেতে বসেছে। ওমানের পক্ষ থেকে নৌপথটি সচল করার জন্য নতুন প্রস্তাব দেওয়া হলেও কোনো সুনির্দিষ্ট সমাধান আসেনি। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, উভয় পক্ষ যদি সংযম প্রদর্শন না করে এবং আলোচনার মাধ্যমে নৌপথটির স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার না করা যায়, তবে এই সংঘাত পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও বিধ্বংসী যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ