১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম ও স্যালাইন মজুত

১১ জেলায় স্বাস্থ্যসেবা সচল রাখতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি, পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম ও স্যালাইন মজুত

জাতীয় ডেস্ক

দেশের বন্যাকবলিত ১১টি জেলায় সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে সরকার। সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল তথা চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন জেলা প্লাবিত হওয়ায় উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ জরুরি স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। একই সঙ্গে দুর্গত এলাকাগুলোর চিকিৎসাকর্মীদের ছুটি বাতিল করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, বন্যার কারণে যোগাযোগ, অর্থনীতি ও সাধারণ জীবনযাত্রার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও সরকার দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিয়েছে। কোনো নাগরিক যেন চিকিৎসাবঞ্চিত না হন, সেজন্য পর্যাপ্ত ওষুধ, স্যালাইন, জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ মোট ১১টি জেলায় বিশেষ চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বন্যার্তদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) খোলা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি জেলার সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য একজন করে জ্যেষ্ঠ চিকিৎসককে মাঠপর্যায়ে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসন, সিভিল সার্জন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের যৌথ সমন্বয়ে দুর্গম এলাকার মানুষ, শিশু এবং গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

দুর্যোগকালীন সাপের উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা ও প্রতিকার নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বন্যার শুরু থেকেই সাপে কাটার ঘটনা মোকাবিলায় বিশেষ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের ওঝা বা কবিরাজের কাছে না নিয়ে সরাসরি নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে আসার জন্য সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। বন্যার প্রথম রাতে সাপে কাটা পাঁচজন রোগীকে সফলভাবে অ্যান্টিভেনম প্রয়োগের মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা হয়েছে।

মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্যাকবলিত জেলাগুলোতে এ পর্যন্ত মোট ৯৫ জন সাপে কাটা রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং তারা সবাই বর্তমানে আশঙ্কামুক্ত। অ্যান্টিভেনমের মজুত প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যসচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানান, জেলা পর্যায়ে বর্তমানে ২১ হাজার ভায়াল এবং কেন্দ্রীয়ভাবে এক হাজারের বেশি ভায়াল অ্যান্টিভেনম মজুত রয়েছে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে আরও ২৫ হাজার ভায়াল অ্যান্টিভেনম রাষ্ট্রীয় মজুতে যুক্ত হবে। ফলে দেশের কোথাও অ্যান্টিভেনম বা জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সংকটের কোনো আশঙ্কা নেই।

সংবাদ সম্মেলনে বন্যাপরবর্তী সময়ে পানিবাহিত ও ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাব রোধে সরকারের নেওয়া প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থার কথা জানানো হয়। চিকিৎসকরা জানান, বন্যা পরিস্থিতির অবণতি বা পানি কমতে শুরু করলে ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড ও চর্মরোগের মতো পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় বন্যাকবলিত এলাকায় ব্যাপক হারে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট (ডব্লিউপিটি) বিতরণ করা হচ্ছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ ওআরএস (খাবার স্যালাইন), প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক এবং অন্যান্য জরুরি ওষুধ মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে গ্রামীণ ও দুর্গম অঞ্চলে অতিরিক্ত মেডিকেল টিম প্রেরণের প্রস্তুতিও রয়েছে সরকারের। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের প্রয়োজনে দ্রুততার সঙ্গে জেলা বা বিভাগীয় শহরের উন্নত হাসপাতালে স্থানান্তরের জন্য বিশেষ পরিবহন ব্যবস্থাও প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

টেলিমেডিসিন ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগের বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস জানান, মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমের পাশাপাশি ডিজিটাল মাধ্যমেও চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা কল সেন্টার ‘১৬২৬৩’ এবং স্বাস্থ্য বাতায়নের মাধ্যমে দুর্গত এলাকার মানুষ ঘরে বসেই স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য ও জরুরি পরামর্শ গ্রহণ করতে পারছেন। একই সঙ্গে বন্যা পরিস্থিতির মধ্যেও ডেঙ্গুসহ অন্যান্য সংক্রামক ব্যাধির বিস্তার রোধে কেন্দ্রীয়ভাবে নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হচ্ছে।

একটি বেসরকারি হাসপাতালের পুনর্নিবন্ধনের আবেদন প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি তাদের পূর্ববর্তী ত্রুটিগুলো সংশোধন করে পুনরায় পরিদর্শনের জন্য আবেদন জমা দিয়েছে। সরকারের যথাযথ কর্তৃপক্ষ হাসপাতালটি সরজমিনে পরিদর্শন করার পর যদি পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবার মান সন্তোষজনক পায়, তবেই আইনানুযায়ী পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ