আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সিরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মরুভূমি এলাকায় যুদ্ধ, সহিংসতা এবং সামাজিক বৈষম্যের শিকার নারীদের জন্য গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী স্বশাসিত জনপদ ‘জিনওয়ার’। কুর্দি ভাষায় যার অর্থ ‘নারীদের পরিসর’। কামিশলি শহরের উপকণ্ঠে ৩০টি বাড়ি নিয়ে গঠিত সম্পূর্ণ নারী-পরিচালিত এই গ্রামে পুরুষদের স্থায়ীভাবে বসবাস বা রাত্রিযাপনের অনুমতি নেই। স্বনির্ভরতা ও সুরক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠা এই গ্রামে কুর্দি, আরব ও ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের নারীরা পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে একটি নতুন জীবনধারা তৈরি করেছেন।
দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত সিরিয়ায় নারীদের নেতৃত্বাধীন এই ধরনের স্বশাসিত অঞ্চলের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক তহবিল ছাড়াই স্থানীয় বাসিন্দারা নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি সমবায়, বেকারি এবং কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। বহিরাগত আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ সুরক্ষার জন্য নারীরা নিজেরাই অস্ত্র ও ওয়াকিটকি হাতে পালাক্রমে গ্রামের প্রবেশপথে পাহারার দায়িত্ব পালন করেন।
যুদ্ধে স্বামী হারানো, পারিবারিক নির্যাতনের শিকার কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার খোঁজে আসা নারীদের জন্য জিনওয়ার এক নতুন আশার আলো। ৫৫ বছর বয়সি কুর্দি ভাষার শিক্ষিকা ওয়েলাত কিংবা ৫৭ বছর বয়সি নুজিন মিহেমেদের মতো অনেকেই এখানে এসে পেয়েছেন মানসিক সমর্থন ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা। অন্যদিকে, আলেপ্পোর বাসিন্দা ২৮ বছর বয়সি জেসমিন ইউরোপে অভিবাসনের সুযোগ ত্যাগ করে এই জনপদে যুক্ত হয়েছেন। এখানকার বৈচিত্র্যময় জাতিগোষ্ঠীর নারীদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং মাটির তৈরি পরিবেশবান্ধব জীবনযাত্রা বর্তমান বিশ্বের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
জিনওয়ারের পাশাপাশি এই অঞ্চলে নারী-পুরুষের যৌথ অংশগ্রহণে পরিচালিত ‘জারুদি’ নামের আরেকটি পরিবেশবান্ধব স্বশাসিত কমিউন গড়ে উঠেছে। ২০১৩ সালে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের পর স্থানীয় বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে একটি গণবাগান ও কৃষিভিত্তিক সমবায় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজস্ব ব্যবস্থাপনার সফল মডেল তৈরি করেন।
আনুষ্ঠানিক কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না থাকলেও এই জনপদগুলো উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার কুর্দি নেতৃত্বাধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রশাসনের আওতায় নিজস্ব নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে। সম্পূর্ণ নিজস্ব উৎপাদিত কৃষিপণ্য, পশুপালন ও ক্ষুদ্র কুটির শিল্পের ওপর ভিত্তি করে এখানকার বাসিন্দারা রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করেই জীবনযাত্রা সচল রেখেছেন, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে নারীদের আত্মমর্যাদা ও অধিকার আদায়ের এক শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়েছে।


