সড়ক ও পরিবহন ডেস্ক
দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করার লক্ষ্যে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দীর্ঘমেয়াদী কৌশলের অংশ হিসেবে প্রায় ১ হাজার ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস (ইভি) পর্যায়ক্রমে রাস্তায় নামানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সারাদেশে সার্বজনীন ইভি চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং নতুন গণপরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে মনোরেল চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও শুরু হয়েছে।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পরিবহন খাতকে অধিকতর পরিচ্ছন্ন ও কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে এই প্রকল্পগুলো হাতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সরকারি পর্যায়ে ইভি বাস সংগ্রহের একাধিক প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এর মধ্যে ৫০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার প্রস্তাবটি অর্থায়নের অপেক্ষায় আছে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায় বাস্তবায়নাধীন ৩০০টি বৈদ্যুতিক বাসের প্রকল্পটি সংশোধন করে বাসের সংখ্যা বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় আরও ৪০০টি বৈদ্যুতিক বাস কেনার একটি প্রস্তাব অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সব মিলিয়ে ১ হাজার ৪০০টির বেশি বৈদ্যুতিক বাস যুক্ত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পের গতিশীলতা নিশ্চিত করতে সরকার ৪০০ কোটি টাকার পৃথক দুটি ক্রয় প্যাকেজ যুক্ত করেছে। এর আওতায় নারী যাত্রীদের জন্য বিশেষ বাস বহর রাখার পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে প্রাথমিকভাবে ১০০টির বেশি বাস অন্তর্ভুক্ত করা হবে। সরকারের লক্ষ্য হলো চলতি বছরের শেষ অথবা আগামী বছরের শুরুর দিকে নির্বাচিত কিছু রুটে অন্তত ২০০টি বৈদ্যুতিক বাস নামিয়ে এর দৃশ্যমান প্রভাব তৈরি করা।
এই উদ্যোগের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলা। এই লক্ষ্যে সরকার সারাদেশে কারিগরি মানদণ্ডের ভিত্তিতে একটি সার্বজনীন চার্জিং অবকাঠামো তৈরির কাজ করছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্পোরেশন (বিআরটিসি) তাদের নিজস্ব জমিতে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে, যা পরবর্তীতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেসরকারি অপারেটরদের জন্যও উন্মুক্ত থাকবে। এই চার্জিং ব্যবস্থা ব্যবহারের জন্য একটি সাধারণ মানদণ্ড প্রণয়ন করা হচ্ছে, যাতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বৈদ্যুতিক যানবাহন সহজেই এসব সুবিধা গ্রহণ করতে পারে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও মান বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)-এর বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটি ব্যাটারি ব্যবস্থা, চার্জিং প্রযুক্তি এবং যান্ত্রিক সহায়তার বিষয়ে অভিন্ন মানদণ্ড নির্ধারণ করছে। বাসের পাশাপাশি পরবর্তীতে বৈদ্যুতিক মিনিবাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রেও এই নীতিমালা সম্প্রসারণ করা হবে।
মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের বাইরে যেসব রুটে বিকল্প গণপরিবহন প্রয়োজন, সেখানে মনোরেল চালুর সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজও বুয়েটকে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) ব্যবস্থা নিয়ে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরির কাজ চলছে।
বিদ্যুৎচালিত প্রযুক্তিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রধান বাধাগুলো হলো প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব এবং উচ্চমূল্য। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে সরকার নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে কর ছাড় ও আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। একইসঙ্গে, প্রযুক্তির উচ্চমূল্য এবং যাত্রীদের জন্য সাশ্রয়ী ভাড়া—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে ভর্তুকি কাঠামো নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈদ্যুতিক বাসের প্রাথমিক সফলতার ওপর ভিত্তি করেই বেসরকারি অপারেটররা এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন। দীর্ঘমেয়াদী এই রূপকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের গণপরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে, যা কেবল পরিবেশবান্ধবই নয়, বরং ব্যয় সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হবে। এর পাশাপাশি থ্রি-হুইলার নিয়ন্ত্রণ এবং মহাসড়ক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন হলে সামগ্রিক পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।


