আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপের প্রধান গৌতম আদানি ও তার ভাতিজা সাগর আদানির বিরুদ্ধে চলমান দেওয়ানি জালিয়াতি মামলার নিষ্পত্তি হতে যাচ্ছে। মামলাটি প্রত্যাহারের অংশ হিসেবে তারা এক কোটি ৮০ লাখ (১৮ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে সম্মত হয়েছেন। মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) এই সমঝোতা চুক্তির প্রস্তাব করেছে, যা চূড়ান্ত কার্যকর হতে দেশটির ফেডারেল আদালতের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে। এই সমঝোতার খবর প্রকাশ্যে আসার পর ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে এবং আদানি গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইসি আদানি গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এই দেওয়ানি মামলাটি দায়ের করে। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছিল, আদানি গ্রিন এনার্জি লিমিটেড একটি বৃহৎ নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের বিপুল অংকের ঘুষ প্রদান করেছিল। পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে বন্ড ইস্যুর মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের সময় এই তথ্য গোপন রাখা হয়। সংস্থাটির দাবি, প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ এবং ঘুষবিরোধী নীতি মেনে চলছে—এমন মিথ্যা ধারণা দিয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে প্রায় ৭৫ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছিল, যার একটি বড় অংশ এসেছিলেন মার্কিন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে।
প্রস্তাবিত এই সমঝোতা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, গৌতম আদানি ও সাগর আদানি তাদের বিরুদ্ধে আনা জালিয়াতি বা অনিয়মের অভিযোগগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার কিংবা অস্বীকার কোনোটিই করবেন না। তবে তারা ভবিষ্যতে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের প্রতারিত না করার, সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘন থেকে বিরত থাকার এবং বাজার কারসাজির মতো কর্মকাণ্ডে না জড়ানোর বিষয়ে আইনি অঙ্গীকারনামা প্রদান করবেন। আদানি গ্রুপ শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মহলে এই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছিল। এই দেওয়ানি নিষ্পত্তির মাধ্যমে গ্রুপটি মার্কিন বাজারে তাদের ব্যবসায়িক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
এদিকে দেওয়ানি মামলার সমান্তরালে মার্কিন বিচার বিভাগ (ডিওজে) কর্তৃক দায়েরকৃত ফৌজদারি জালিয়াতির অভিযোগটিও প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে। জানা গেছে, আদানি গ্রুপ যুক্তরাষ্ট্রে একটি নতুন ও প্রভাবশালী আইনজীবী দল নিয়োগের পর মার্কিন বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের সাথে চলমান আলোচনায় বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ওই আইনি প্রতিনিধি দল মার্কিন কর্তৃপক্ষকে আশ্বস্ত করেছে যে, ফৌজদারি অভিযোগগুলো প্রত্যাহার করা হলে আদানি গ্রুপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বৃহৎ পরিসরে নতুন বিনিয়োগ করবে, যা দেশটির স্থানীয় অর্থনীতিতে হাজারো কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখবে। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নীতি পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটও এই আইনি নমনীয়তার পেছনে পরোক্ষ প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।
আদানি গ্রুপ মূলত জ্বালানি, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎসহ বিভিন্ন মৌলিক অবকাঠামো খাতে আন্তর্জাতিক স্তরে বিস্তৃত বিনিয়োগের জন্য সমাদৃত। ফোর্বসের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ৬৩ বছর বয়সী শিল্পপতি গৌতম আদানির মোট ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা তাকে বৈশ্বিক শীর্ষ ধনকুবেরদের তালিকায় অন্যতম প্রধান অবস্থানে ধরে রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে এই আইনি বিরোধের অবসান ঘটলে দক্ষিণ এশিয়া ছাড়িয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি ও অবকাঠামো খাতে আদানি গ্রুপের বাণিজ্যিক অবস্থান আরও সুসংহত হবে এবং আন্তর্জাতিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাদের রেটিং উন্নত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


