আন্তর্জাতিক ডেস্ক
চলমান কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সামরিক সংঘাতে ফিরে যাওয়ার প্রস্তুতি ঘোষণা করেছে ইরান। একই সঙ্গে দেশটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের এই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাব শুধু আঞ্চলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা সরাসরি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবন ও দেশটির অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, ইরানের বিরুদ্ধে চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান আর্থিক ব্যয় শেষ পর্যন্ত আমেরিকার সাধারণ জনগণকেই বহন করতে হবে। নিজের দাবির সপক্ষে তিনি মার্কিন ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধির একটি চিত্রও প্রকাশ করেন।
তিনি দাবি করেন, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হরমুজ প্রণালি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই অচলাবস্থার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মতে, জ্বালানির বাজার ও শেয়ারবাজারের অস্থিরতার পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদের ওপর আসল চাপ আসবে ঋণ ও গৃহঋণের (মর্টগেজ) সুদের হার বৃদ্ধির মাধ্যমে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, চলমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি ঋণের খেলাপি হওয়ার হার গত ৩০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। যুদ্ধের হুমকি বজায় থাকলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হবে এবং মার্কিন অর্থনীতি মন্দার দিকে ধাবিত হতে পারে।
অনুরূপ সুর মিলিয়ে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ মার্কিন নীতিকে কটাক্ষ করে বলেন, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে একটি ‘অভিনয়ধর্মী যুদ্ধ’ পরিচালনা করা হচ্ছে, যা প্রকারান্তরে একটি নতুন বৈশ্বিক আর্থিক সংকট ডেকে আনতে পারে।
অর্থনৈতিক সূচক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩০ বছর মেয়াদি ২৫ বিলিয়ন ডলারের বন্ড ৫ শতাংশ সুদে বিক্রি করেছে, যা গত দুই দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ সুদের হার। এর পাশাপাশি ১০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হারও এক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, হরমুজ সংকটের কারণে বিশ্ব বাজারে জ্বালানির দাম এবং মূল্যস্ফীতি অনিয়ন্ত্রিত হলে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার আরও বাড়িয়ে দিতে পারে, যা বৈশ্বিক বাজারকেও প্রভাবিত করবে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক আলোচনার সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। ইরান এই জলপথে নিজেদের সার্বভৌম অধিকার ও একক কর্তৃত্বের স্বীকৃতি দাবি করলেও, উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য দেশ এবং পশ্চিমা বিশ্ব এটিকে আন্তর্জাতিক জলপথ হিসেবে উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়ে আসছে।
এই প্রসঙ্গে ইরানি পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান এব্রাহিম আজিজি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের জন্য তেহরান একটি নতুন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা চূড়ান্ত করেছে। এই প্রক্রিয়ায় ইরানের নীতিমালার সঙ্গে সহযোগিতাকারী বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বিশেষ সুবিধা পাবে এবং নির্দিষ্ট ট্রানজিট ফি দিয়ে চলাচল করতে পারবে। তবে এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচল আইনের পরিপন্থী কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।


