বিনোদন ডেস্ক
ঈদুল আজহার ছুটির পর প্রেক্ষাগৃহে বড় বাজেটের এবং তারকা-সমৃদ্ধ চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সমান্তরাল ধারার সিনেমার ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। মুক্তির প্রথম সপ্তাহে তারকা-প্রভাবিত চলচ্চিত্র প্রেক্ষাগৃহে ব্যাপক সাড়া জাগালেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শক্তিশালী চিত্রনাট্য ও নির্মাণশৈলী-নির্ভর ভিন্নধর্মী গল্পের সিনেমা দর্শক চাহিদার শীর্ষে উঠে এসেছে। স্টার সিনেপ্লেক্স ও ব্লকবাস্টার সিনেমাসসহ দেশের প্রধান মাল্টিপ্লেক্সগুলোর সাম্প্রতিক টিকিট বিক্রির পরিসংখ্যান এবং শো বৃদ্ধির চিত্র এই পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
চলতি মৌসুমে মুক্তিপ্রাপ্ত অ্যাকশন-ড্রামা ঘরানার বড় বাজেটের একটি চলচ্চিত্র এবং সমান্তরাল ধারার একটি ভিন্নধর্মী চলচ্চিত্র—উভয়ের বাণিজ্যিক গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দর্শক রুচির এই রূপান্তর স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুক্তির ২১তম দিনে দেশের প্রধান মাল্টিপ্লেক্সগুলোর অনলাইন অগ্রিম টিকিট বুকিং এবং দৈনিক আয়ের হিসাব অনুযায়ী, ভিন্নধর্মী গল্পের চলচ্চিত্রটি শো-র সংখ্যা এবং একক দিনের বক্স অফিস কালেকশনে বড় বাজেটের চলচ্চিত্রটিকে ছাড়িয়ে গেছে। ২১তম দিনে প্রথম চলচ্চিত্রটির ২২টি শো থেকে মোট আয় হয়েছে ১ লাখ ২৯ হাজার টাকা। অন্যদিকে, প্রবল দর্শক চাহিদার কারণে দ্বিতীয় চলচ্চিত্রটি দৈনিক ২৮টি শো নিয়ে প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছে এবং একই দিনে এর মোট আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২৬ হাজার টাকা, যা প্রথমটির তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তির প্রথম সপ্তাহে তারকা-খ্যাতি এবং ব্যাপক প্রচারণার কারণে বাণিজ্যিক ধারার সিনেমাগুলো বক্স অফিসে বড় ধরনের ওপেনিং পায় এবং সামগ্রিক আয়ের অঙ্কে কিছুটা এগিয়ে থাকে। তবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সপ্তাহে এসে দর্শক ধরে রাখার ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করে ছবির গল্প, পরিচালনা এবং অভিনয়শিল্পীদের পারফরম্যান্স। দুর্বল চিত্রনাট্য এবং চেনা ছকের কাহিনীর কারণে অনেক বড় বাজেটের সিনেমা প্রাথমিক জোয়ারের পর দ্রুত দর্শক হারাতে শুরু করে। বিপরীতপক্ষে, সীমিত বাজেট ও পরিমিত প্রচারণার সত্ত্বেও কেবল ইতিবাচক মাউথ-পাবলিসিটি বা দর্শকদের মুখের কথার ওপর ভিত্তি করে ভিন্নধর্মী সিনেমাগুলো দীর্ঘমেয়াদে প্রেক্ষাগৃহে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নেয়।
বক্স অফিসের এই ধারা কেবল অভ্যন্তরীণ বাজারেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং আন্তর্জাতিক বাজারেও এর ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বর্তমান সময়ে নির্মিত ভিন্নধর্মী ঘরানার সিনেমাগুলো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগাচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশকদের মাধ্যমে নিয়মিত বাণিজ্যিক প্রদর্শনী থেকে বড় অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হচ্ছে, যা দেশীয় চলচ্চিত্রের সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। লগ্নিকৃত অর্থ তুলে আনার ক্ষেত্রে কম বাজেটের এই সিনেমাগুলো অনেক বেশি নিরাপদ এবং লাভজনক হিসেবে প্রমাণিত হচ্ছে, যা নতুন নির্মাতাদের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা।
দেশের প্রেক্ষাগৃহে এই দুই ধারার চলচ্চিত্রের মূল অভিনয়েও রয়েছে ভিন্নতা। প্রথম চলচ্চিত্রে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় এক তারকা, যার সাথে যুক্ত ছিলেন সাবিলা নূর, তানজিয়া জামান মিথিলা, কাজী সাবির এবং তারিক আনাম খানের মতো পরিচিত মুখ। অন্যদিকে, মেজবাউর রহমান সুমনের পরিচালনায় ভিন্নধর্মী গল্পের দ্বিতীয় চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষি, গাজী রাকায়েত ও আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ। তারকা-চমকের চেয়ে চরিত্রের গভীরতা ও অভিনয়ের ওপর নির্ভর করেই এই সিনেমাটি বক্স অফিসে তার শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বাজার এখন আর কেবল একক কোনো তারকার ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং দর্শকরা এখন কনটেন্ট বা মানসম্মত গল্পকে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। মাল্টিপ্লেক্স সংস্কৃতির বিকাশ এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত দর্শকের প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যাবর্তন চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারাকে বদলে দিচ্ছে। এবারের ঈদের বক্স অফিসের এই নীরব জয়জয়কার ভবিষ্যতে বাংলাদেশের নির্মাতাদের মৌলিক এবং বৈচিত্র্যময় গল্প নিয়ে কাজ করতে আরও বেশি উৎসাহিত করবে বলে মনে করছেন চলচ্চিত্র বোদ্ধারা।


